বৃহস্পতিবার, ১২ জানুয়ারি, ২০১২

এক-এগারোর গরল অমৃতসমান

সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী জরুরি সরকারের বিরুদ্ধে তার নেত্রী শেখ হাসিনাকে কারাবন্দি অবস্হায় খাদ্যে বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আবারও আনলেন। পাঠকের স্মরণে থাকার কথা, কিছুদিন আগেও এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ সংসদে দাঁড়িয়ে একই অভিযোগ তুলে সারাদেশে একেবারে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। সে সময় তার সঙ্গে পালাগানের দোহারের মতো পোঁ ধরেছিলেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং বর্তমান সরকারের কথিত নবরত্মের অন্যতম ডা. াদাচ্ছের আলী। ডাক্তার সাহেব দাবি করেছেন যে, এই বিষপ্রয়োগের ঘটনাটি শেখ হাসিনা কারাবন্দি থাকা অবস্হায় তিনিও নাকি টের পেয়েছিলেন। বিশেষ কারাগার থেকে সরবরাহকৃত বিষমিশ্রিত খাদ্যগ্রহণের ফলে শেখ হাসিনার চোখ-মুখ ফুলে যাওয়া, চুল পড়ে যাওয়া, ইত্যাকার উপসর্গ তখন দেখা দিয়েছিল। আওয়ামী সমর্থক মিডিয়া তাদের চরিত্রানুযায়ী দিনকয়েকের জন্য শেখ হাসিনাকে জরুরি সরকারের কথিত হত্যাচেষ্টা নিয়ে মাঠ বেশ গরমও করে ফেলেছিল।

সুযোগ বুঝে বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বেগম খালেদা জিয়ার খাদ্যেও বিষ মেশানোর মৃদু অভিযোগ তুলেছিলেন; কিন্তু তার সমর্থনে দলের অন্য প্রভাবশালী নেতারা এগিয়ে না আসায় বিষয়টি তেমন একটা জমেনি। তাছাড়া মরে গেলাম, মেরে ফেলল জাতীয় সস্তা বক্তব্য দিয়ে নাটক করার বাতিক রাশভারী এবং কঠোর আত্মসম্মান বোধের অধিকারিণী বিএনপি চেয়ারপার্সনের যে নেই, সে বিষয়ে দেশবাসী ভালো রকম অবহিত। জনসভায় একজনের বুলেটপ্রুফ কাচের পেছনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেয়ার অভ্যাস এবং অপরজনের সে ধরনের যে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী ঠেলে সরিয়ে দিয়ে জনগণের মুখোমুখি হওয়ার আত্মবিশ্বাসের মধ্যেই দুই নেত্রীর আচরণের পার্থক্য প্রকাশমান। দেশবাসীর এটাও জানা যে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশল বরাবরই আবেগনির্ভর। কাজেই আগামী সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণাকালে আওয়ামী সমর্থকদের অশ্রুসজল করে তোলার জন্য বিষপ্রয়োগের গল্পটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারত। নির্বাচনী সভাগুলোতে দলীয় নেত্রী চোখ মুছতে মুছতে বলতে পারতেন, গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের মতো তিনিও একদা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জেনে-শুনে বিষ পান করেছিলেন। আওয়ামী লীগের দুর্ভাগ্য যে, এমন একটা সুবর্ণ সুযোগ এখন প্রধানমন্ত্রী তনয়ের প্রকাশ্যে এক-এগারো সরকারের প্রশস্তির জন্য হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সম্প্রতি নিউইয়র্কে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আকৃষ্ট করার জন্য আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তার মায়ের উপস্হিতিতেই সজীব ওয়াজেদ জয় মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের ভুয়সী প্রশংসা করেছেন। যে নরাধমরা শেখ হাসিনার মতো নেত্রীকে হত্যা করার হীন উদ্দেশ্যে বন্দি অবস্হায় খাদ্যে বিষ পর্যন্ত নির্দ্বিধায় প্রয়োগ করতে পেরেছে, তাদের প্রশংসা তারই আত্মজের কণ্ঠে! সাজেদা চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন নাকি শেখ হাসিনার বিষের যাতনায় কাতর চেহারা দেখে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। এসব তোষামোদি বক্তব্যে বিশ্বাস করলে বলতে হবে, আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর প্রতি তার সহকর্মীদের ভালোবাসা আপন একমাত্র পুত্রের তুলনায় অনেক বেশি। রাজপরিবারের মা-ছেলের পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ে আমজনতার জানার কোনো উপায় নেই। বড়লোকের বড় ব্যাপার, এমন আজব কান্ড ঘটলেও ঘটতে পারে। তবে রহস্য ভেদের চেষ্টা হিসেবে এক-এগারো সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের পুরনো যোগাযোগের কাহিনী ভুলো বাঙালির বিবেচনার জন্য স্মরণ করিয়ে দেয়া যেতে পারে।

জেনারেল মইন আন্তর্জাতিক মহলের সরাসরি নির্দেশেই যে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, সে ইতিহাস এখন সবারই জানা। কিন্তু পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের মধ্যে চারদলীয় জোট সরকারের সময়ই বাংলাদেশে একটি সেক্যুলার সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ধারণা করা গেলেও প্রমাণ করা আপাতত কঠিন। দেরিতে হলেও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমএ জলিল নানারকম সমঝোতার কাহিনী সম্প্রতি প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। অবশ্য আওয়ামী চাপের মুখে নিজেকে এক অর্থে মস্তিষ্ক-বিকৃত ঘোষণা করে নিজ অবস্হান থেকে সরে আসারও চেষ্টা করছেন তিনি। এক-এগারো পুর্ববর্তী টালমাটাল পরিস্হিতিতে জেনারেল মইন সম্ভবত সেনাবাহিনীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, তিনি একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি এবং যুধ্যমান দুই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কোনো পক্ষের প্রতিই তার কোনো বিশেষ দুর্বলতা নেই। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ অবশ্য প্রমাণ করেছে যে, মইন সেক্যুলার ক্যাম্পেরই সদস্য ছিলেন এবং ডিজিটাল নির্বাচনের মাধ্যমে কোন পক্ষকে ক্ষমতাসীন করা হবে- সেটি তিনি ক্ষমতা দখলের আগে থেকেই জানতেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ পরিচালনায় ডিজিএফআইর তৎকালীন তিন কর্তা- মেজর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ, মেজর জেনারেল (অব.) আমিন এবং ব্রি. জেনারেল (পলাতক) বারীর ভুমিকা সম্পর্কে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের সিংহভাগই অবগত আছেন। ডিজিএফআইর উল্লিখিত ত্রিমুর্তি, সেনাপ্রধান জেনারেল মইন এবং নবম ডিভিশনের সাবেক প্রধান ও বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার পদে কর্মরত জেনারেল মাসুদের মধ্যে বিদেশি সুতোর টানে বাংলাদেশের বারোটা বাজানোর কাজে কে কাকে ব্যবহার করেছেন, তা তারাই ভালো জানেন। তবে সে সময় জেনারেল মইনের সঙ্গে সজীব ওয়াজেদ জয়ের যে বিশেষ সখ্য গড়ে উঠেছিল, সেটি কোনো পক্ষই লুকানোর চেষ্টা করেননি। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা কারাবন্দি থাকা অবস্হায় যখন সাজেদা চৌধুরীর দাবি অনুযায়ী বিষমিশ্রিত খাবার গলাধঃকরণ করছিলেন, মনে পড়ছে তখনও সজীব জয় জেনারেল মইনকে একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দু’জনের সাক্ষাতের আয়োজন করার জন্য শোনা যায় বাংলাদেশ থেকে গুরুত্বপুর্ণ সামরিক কর্তারাও জেনারেল মইনের সেদেশে সফরে যাওয়ার আগেই ঘুরপথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উপস্হিত হয়েছিলেন। শোনা কথার প্রমাণ নেই এটা ঠিক হলেও আশির দশক থেকে বাংলাদেশে যত সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, তার সবক’টির সরাসরি সুবিধাভোগী যে দলগতভাবে আওয়ামী লীগ এবং ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনা- এই সত্য অস্বীকারের উপায় নেই। অধিকতর বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বিএনপি প্রশাসন কতৃêক নিযুক্ত প্রতিজন সেনাপ্রধান পরবর্তী সময়ে অবধারিতভাবে বিএনপিকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছেন। জেনারেল এরশাদ, জেনারেল নাসিম এবং জেনারেল মইনের আচরণে বাহ্যিক তফাত থাকলেও তাদের মুল লক্ষ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ২০০৬-এর শেষার্ধে যে সাবেক সেনাপ্রধানকে বিএনপির স্হায়ী কমিটির সদস্যপদে সর্বশেষ নিয়োগ দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে, তিনিও সময়মত বিশ্বাসঘাতকের চেহারা দেখাতে কিছুমাত্র সঙ্কোচ করেননি। লোকমুখে শুনেছি, জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান মরহুম সাইফুর রহমানের বাসগৃহে সংঘটিত মধ্যরাতের ক্যু দেতা সফল করানোর জন্য তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা আমাকে বলেছেন, জেনারেল মাহবুব নাকি সেই বহুল আলোচিত তথাকথিত চায়ের দাওয়াতে অংশগ্রহণ করার জন্য তৎকালীন সামরিক জান্তার পক্ষ থেকে তাদের প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়েছিলেন।

সাবেক সেনাপ্রধানদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মধুর সম্পর্কের একটা পরম্পরা দৃশ্যমান হলেও নীতিগতভাবে সেনাবাহিনীর প্রতি আওয়ামী নেতৃত্বের ঐতিহাসিক বিতৃষ্ণার বিষয়টি সর্বজনবিদিত। অ্যান্হনি মাসকারেনহাস তার ‘লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্হে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের সেনাবাহিনী-বিদ্বেষের কথা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন। সে সময় সেনাবাহিনীকে বিলুপ্ত করে রক্ষীবাহিনী নাম দিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক একটি রাজনৈতিক সশস্ত্র বাহিনী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা সর্বক্ষণ জপলেও মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবদীপ্ত ভুমিকার প্রসঙ্গ উঠলেই যে মারমুখী হয়ে ওঠেন, তার প্রমাণ আমরা মাত্র ক’দিন আগেই জাতীয় সংসদে দেখতে পেয়েছি। স্বাধীনতা সংগ্রামে ভুমিকা রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) তাজ সংসদে তৎকালীন সেনাসদস্যদের প্রশংসা করে তার নিজ দলের সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়েছিলেন। ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ রাইফেলসের নাম পাল্টে বর্ডার গার্ড করার আজগুবি প্রস্তাব যাদের মস্তিষ্ক থেকে আসে, তারা দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীকে কী নজরে দেখে থাকেন, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। বিএনপিকে ক্যান্টনমেন্টে সৃষ্ট দল হিসেবে অভিহিত করে হেয় করার অপচেষ্টাও সেনাবাহিনীবিরোধী মানসিকতা থেকেই উদ্ভুত। যে সজীব ওয়াজেদ জয় তার মাকে হত্যার প্রচেষ্টায় অভিযুক্ত একই সেনাপ্রধানকে বিস্ময়করভাবে একজন ভদ্রলোক হিসেবে প্রত্যয়ন করেছেন, সেই একই ব্যক্তি ইরাকে মুসলমান নিধনে অংশগ্রহণকারী ইসলামবিদ্বেষী বিদেশির সঙ্গে যৌথভাবে যখন লেখালেখি করেন, তখন তার ভেতরের সেনাবাহিনী-বিদ্বেষী মনোভাব মুখব্যাদান করে ঠিকই প্রকাশিত হয়। সুতরাং, সেনাপ্রধানদের সঙ্গে বিগত তিরিশ বছর ধরে আওয়ামী লীগের যে প্রেম-ভালোবাসা আমরা বাইরে থেকে প্রত্যক্ষ করছি, তা যে কেবলই লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত, সে বিষয়টি দেশের জনগণ দ্রুত উপলব্ধি করলেই দেশের স্বাধীনতা রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি লড়াই-সংগ্রামে আমাদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা আল্লাহর রহমতে বৃদ্ধি পাবে। এই বিশেষ সম্পর্ক তৈরির অনুঘটক হিসেবে বিশেষ রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্হাগুলোর ভুমিকা পালনের সুযোগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভালোভাবেই সৃষ্টি হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে এক-এগারো সমর্থনকারী একাধিক রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্হার কর্তাব্যক্তিদের ঘন ঘন বাংলাদেশ সফর এবং তৎকালীন সরকারে মুখ্য ভুমিকা পালনকারীদের সঙ্গে সেই গোয়েন্দাদের গোপন আলাপ-আলোচনার গুঞ্জন বাতাসে ভাসমান ছিল ও আছে। ক্ষমতাসীন দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এসব আঁতাতের ঘটনাই এখন প্রকাশ করে ফেঁসে গেছেন।

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই অবশেষে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, এক-এগারোর পেছনে সাম্রাজ্যবাদী এবং আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রগুলো এবং এদেশের সুশীল (?) সমাজের প্রত্যক্ষ ভুমিকা ছিল। দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে এই ভুমিকার জন্য সেসব রাষ্ট্রের বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদুতদের বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা হয়েছে। ভিনদেশি দুতদের মধ্যে অতিউৎসাহী দুই-একজন থাকলেও আমার ধারণা, তারা সামগ্রিকভাবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের আঞ্চলিক ক্ষমতাধর বন্ধুরাষ্ট্রের যৌথ নীতি বাস্তবায়ন করেছেন মাত্র। এক-এগারোর সময়কার দৃশ্যত সবচেয়ে কর্মব্যস্ত রাষ্ট্রদুত আনোয়ার চৌধুরীও তার সর্বশেষ বাংলাদেশ সফরে এসে মোটামুটি এ কথাটিই বলার চেষ্টা করেছেন। আঁতাতের মাধ্যমে জরুরি অবস্হা জারি এবং পরবর্তী দু’বছরে যত ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতা হয়েছে, সেখানে আওয়ামী লীগ এবং বিশেষ সংস্হার পাশাপাশি ওয়াশিংটন, লন্ডন এবং দিল্লির সরকারি মহলের যে প্রত্যক্ষ ভুমিকা ছিল, সেটাই আনোয়ার চৌধুরী, এমএ জলিল এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে এবার প্রমাণ হলো। রাজনৈতিক লক্ষ্য পুরণের কৌশল হিসেবে বিদেশের রাজধানীতে সম্পর্ক তৈরিতে আওয়ামী লীগ দেশে তার প্রতিপক্ষ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছে, এই বাস্তবতার সঙ্গে সম্ভবত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মোটেও দ্বিমত করবেন না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মারপ্যাঁচ ছাড়াও কাকতালীয়ভাবে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের পরিবারে আত্মীয়তা সুত্রে বিদেশি সংযোগ হয়তো ওয়াশিংটন, লন্ডন কিংবা দিল্লিতে প্রয়োজনীয় প্রভাব বলয় তৈরিতে সহায়তা করছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির আজকের বাস্তবতা হলো, ক্ষমতায় আরোহণ কিংবা টিকে থাকা উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর রাজধানীর আনুকুল্য প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই অসংখ্যবার দাবি করেছেন, গ্যাস রফতানি করতে রাজি না হওয়ার কারণে তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেননি। একই যুক্তিতে আমাদের ধরে নিতে হবে যে, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগেই বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক লবির প্রয়োজনীয় সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বৃহত্তর স্বার্থ হাসিলের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দেয়ার পুরনো কৌশল অবলম্বন করেই শেখ হাসিনা এবং তার দল ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করতে পেরেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় সভানেত্রীর স্বল্পসময়ের জন্য বিষমিশ্রিত খাদ্য গলাধঃকরণ হয়তো এমন কোনো বৃহৎ আত্মত্যাগ নয়। সজীব ওয়াজেদ জয় এক-এগারোর সরকারের প্রশংসার মাধ্যমে তার মায়ের নেতৃত্বাধীন দলের নেতাকর্মীদের এই বার্তাটিই সম্ভবত পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু চাটুকাররা যে কিছুতেই দমে যাওয়ার পাত্র নন, তার প্রমাণ দেয়ার জন্য কুলীন সৈয়দ বংশজাত সাজেদা চৌধুরী মাত্র একটি সপ্তাহ অপেক্ষা করারও ধৈর্য দেখাতে পারেননি। এক-এগারোর গরল যে আওয়ামী লীগের জন্য অমৃতসমান ছিল, সেটি না বুঝেই দলীয় নেতাকর্মীদের সভায় বিষপ্রয়োগের ভাঙা রেকর্ড বাজাতে এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ কিছুমাত্র লজ্জাবোধ করেননি। জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারী জমানায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন- উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মহাজোট বানিয়েছে স্বৈরাচারের প্রতিভু সেই এরশাদকে সঙ্গী করেই। কাজেই বর্তমান সরকারের আমলে আমাদের স্বদেশ যে পুরনো উদ্ভট উটের পিঠেই পুনর্বার সওয়ার হয়েছে, তাতে আর বিস্ময়ের কী আছে

(সুত্র, আমার দেশ, ০১/১০/২০০৯)

বেরুবাড়ী ফেরত আনুন

আর ক’দিন পর দিন বদলের সনদ পাওয়া সরকারের বর্ষপূর্তি হতে যাচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এ সময়ের মধ্যে কতখানি পূরণ হয়েছে তার কোনো হিসাব আমার কাছে না থাকায়, সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করাই শ্রেয়। গত বছরের নির্বাচনী প্রচারের সময় আওয়ামী লীগের বেশুমার প্রতিশ্রুতিতে যারা মুগ্ধচিত্তে আস্থা স্থাপন করেছিলেন, চাওয়া-পাওয়ার হিসাব তাদেরই মিলিয়ে দেখা উচিত। তবে সরকারের এক বছরের শাসনকার্য পরিচালনার ধারা দেখে আমার কাছে অন্তত মনে হয়েছে, সঙ্কীর্ণ দলীয় ও পারিবারিক অ্যাজেন্ডার বাইরে ক্ষমতাসীনরা একটি পা-ও ফেলেননি। এই এক বছরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগে তার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে পেরেছেন, ‘জাতির পিতার পরিবার নিরাপত্তা আইন, ২০০৯’-এর নামে প্রকৃতপক্ষে মরহুম ওয়াজেদ মিঞা ও শফিক সিদ্দিকীর পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অন্যান্য বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে, শেখ মুজিব হত্যা মামলার শুনানি সর্বোচ্চ আদালতে সমাপ্ত করে আজ রায় প্রদান এবং পরে সেই রায় বাস্তবায়নের অপেক্ষা এবং সভানেত্রীসহ আওয়ামী লীগের তাবৎ নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে জরুরি সরকারের দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। বিপরীত দিকে বেগম খালেদা জিয়াসহ মরহুম জিয়াউর রহমানের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আগের সরকারের দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের পরিবর্তে সচল করা তো হয়েছেই, উপরন্তু নতুন করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হচ্ছে। কোনো রাখঢাক না করেই আইন প্রতিমন্ত্রী দেশবাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করার জন্য তিনি প্রতিমন্ত্রীর চেয়ারে বসেননি। বেগম খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় অবস্থিত বাসগৃহ থেকে উচ্ছেদের সব রকম চেষ্টা হাইকোর্টে আটকে যাওয়ার পর কিছু দিনের জন্য কৌশলগত পিছু টান দেয়া হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের যে ফিরিস্তি দিলাম, তার সাথে জনগণের স্বার্থ কোথায় জড়িত এটা আমার পক্ষে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। পুরনো বছর না হয় বাদই দিলাম। আগামী এক বছরে সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায়ও জনস্বার্থ বলতে গেলে উপেক্ষিতই থাকছে। শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড মামলার সুরাহা হওয়ার পর ২১ আগস্ট, ২০০৪ আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা, চট্টগ্রাম ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বিডিআর বিদ্রোহের একাধিক বিচার নিয়েই সম্ভবত প্রশাসনযন্ত্র ব্যস্ত থাকবে। সম্প্রতি আবার রাষ্ট্রকে ’৭২-এর সংবিধানে ফিরিয়ে নেয়ার নতুন লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় প্রতিদিন নিত্যনতুন দেশী-বিদেশী ‘জঙ্গি’ আবিষ্কারের লোমহর্ষক কল্পকাহিনী প্রচারের ব্যস্ততা তো রয়েছেই। তথাকথিত দিন বদলের সনদে গণ-মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল সেগুলো বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, সে সংক্রান্ত কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের কোনো গরজ সরকারের আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।
যা হোক, আজকের কলামে মূলত সরকারের বাহাত্তরের সংবিধানে প্রত্যাবর্তনের অ্যাজেন্ডা নিয়েই আলোচনা সীমিত রাখব। আওয়ামী লীগ নেতাদের কণ্ঠে বাহাত্তরের সংবিধানের গুণকীর্তন শুনলে যে কারো মনে হতে পারে, বাংলাদেশের তাবৎ সমস্যা সমাধানের মোক্ষম দাওয়াই বুঝি ওই এক সংবিধান সংশোধনের মধ্যেই রয়েছে। আর ভাগ্যের বরপুত্র রাজনৈতিক দলটির পোঁ ধরা সংবাদমাধ্যম তো রয়েছেই যেকোনো বিষয়ে তাদের যেকোনো বক্তব্যকেই বেদবাক্য হিসেবে জনগণের মধ্যে প্রচারের জন্য। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আওয়ামী লীগ সমর্থক বুদ্ধিজীবী, কলাম লেখকরা হরহামেশাই ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে হা-হুতাশ করে থাকেন। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই কর্মটিতে বর্তমান ক্ষমতাসীনেরাই সর্বাপেক্ষা পারদর্শী। ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই জানা যাবে, পাকিস্তান জামানায় ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান পূর্ব এবং পরবর্তী শেখ মুজিবের রাজনৈতিক উচ্চতায় আসমান-জমিন ফারাক।

আন্দোলনকালীন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিব কারারুদ্ধ ছিলেন এবং তাকে কারামুক্ত করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রায় নব্বই বছরের মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের প্রকৃত নায়কের নাম যে মওলানা ভাসানী, সেই সত্য চল্লিশ বছর ধরে চলমান আওয়ামী প্রচারের তোড়ে প্রায় ভেসে গেছে। শুধু তাই নয়, ১৯৪৭ সালে প্রথমবার স্বাধীনতা পাওয়ার পর পাকিস্তানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল মুসলিম লীগের বিরোধিতা করে পূর্বাঞ্চলে আওয়ামী লীগ নামের রাজনৈতিক দলটির জন্মও হয়েছিল একই মওলানা ভাসানীর হাত ধরেই। ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম শুরু হওয়ার আগেই ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিব নিজ বাসগৃহ থেকেই পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা দিয়েছিলেন। অপর দিকে ৯১ বছরের মওলানা ভাসানী তার সহকর্মীদের নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার মহান যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এই বয়োবৃদ্ধ জননেতাকে যুদ্ধে অংশ নিতে না দিয়ে দেরাদুনে অন্তরীণ করে রেখেছিলেন তার সাম্রাজ্যবাদ এবং আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ভাসানী নভোথিয়েটার নামটি নাকি একেবারেই অসহ্য ঠেকে। তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামে আপসহীন মওলানা ভাসানীর নামের স্থানে তার পিতার নাম প্রতিস্থাপন করে তৃপ্তি লাভ করতে পারেন, কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস শেষ অবধি পাল্টাতে সক্ষম হবেন না। মওলানা ভাসানীর অনেকগুলো সম্পাদকের মধ্যে যৌবনের শেখ মুজিব একজন মাত্র ছিলেন এই ইতিহাস মুছে ফেলা কঠিন। লিখতে চেয়েছিলাম কেবলই সংবিধান নিয়ে। বোধহয় যেদিন লিখছি সেই দিনটি মজলুম জননেতার ৩৩তম মৃত্যুদিবস বলেই আবেগতাড়িত হয়ে লেখাটি খানিকটা দিক পরিবর্তন করে ফেলেছে। তবে ইতিহাস বিকৃতির যে ধারা মওলানা ভাসানীর ক্ষেত্রে ঘটেছে, সেই একই পরম্পরা আমরা বাহাত্তরের সংবিধান বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ করব।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হওয়ার পর বিগত ৩৭ বছরে ১৪টি সংশোধনী আনা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি আনা হয়েছিল প্রথম তিন বছরে শেখ মুজিবের শাসনকালীন। চারটি সংশোধনীর সময় এবং বিষয়াবলি সম্পর্কে জানা পাঠকের জন্য আবশ্যক বিবেচনা করছিঃ
০১. প্রথম সংশোধনী (১৯৭৩ সালের ১৫ নম্বর আইন) ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই সংসদে গৃহীত হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের সুবিধার্থে মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত সংবিধানের ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদে এই সংশোধনী আনা হয়।

০২. দ্বিতীয় সংশোধনী (১৯৭৩ সালের ২৪ নম্বর আইন) ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সংসদে গৃহীত হয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে ব্যর্থ হয়ে মরহুম শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন সরকার চরম নিবর্তনমূলক এই বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রবর্তন করে। যেহেতু এটি একটি জনগণের মৌলিক অধিকারবিরোধী আইন সে কারণে সংবিধানে ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অর্থাৎ মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত মূল অনুচ্ছেদটি এই আইনের মাধ্যমে সংশোধন করা হয়। এই আইনের বলেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়ে থাকে যার সর্বশেষ অপপ্রয়োগ আমরা তথাকথিত এক-এগারো সরকারের শাসনামলে দেখেছি।

০৩. তৃতীয় সংশোধনী (১৯৭৪ সালের ৭৪ নম্বর আইন) ১৯৭৪ সালের ২৮ নভেম্বর সংসদে অনুমোদিত হয়। এই আইনের মাধ্যমেই বাংলাদেশের মানচিত্র পরিবর্তন করে বেরুবাড়ী ভারতকে দেয়া হয় এবং মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী এই ছিটমহলের বিনিময়েই মাত্র তিন বিঘা আয়তনের একটি করিডোর বাংলাদেশের প্রাপ্য ছিল যাতে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার অবরুদ্ধ জনগণ বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। মূল চুক্তিটি একই বছর ১৬ মে দিল্লিতে স্বাক্ষরিত হয়।

০৪. চতুর্থ সংশোধনী (১৯৭৫ সালের ২ নম্বর আইন) ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে গৃহীত হওয়ার ফলে বাংলাদেশে একদলীয় ফ্যাসিবাদী সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বিচার বিভাগের অধিকার বিশেষত উচ্চ আদালতের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিপ্রায়ে মূল সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। ফ্যাসিবাদী একদলীয় শাসনব্যবস্থাকে আবার ‘মুজিববাদ’ নাম দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার নতুন তত্ত্ব হিসেবে হাজির করার হাস্যকর এবং ব্যর্থ প্রচেষ্টা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রজন্মকে দেখতে হয়েছে। সৌভাগ্যবশ্যত চতুর্থ সংশোধনীর ক্ষমতাবলে গঠিত সরকারের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ছয় মাস ২০ দিন। বাংলাদেশের সংবিধানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং গণবিরোধী আইন হিসেবে চতুর্থ সংশোধনী ধিকৃত হয়ে আছে। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে মুজিববাদও বিলুপ্ত হয়েছে।

লক্ষ করার বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ অথবা এর সমর্থক বুদ্ধিজীবীকুল এই চার সংশোধনী নিয়ে আলোচনায় কোনো উৎসাহ বোধ করেন না। নতুন প্রজন্মকে সুপরিকল্পিতভাবে এমন একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধনের পরম্পরা পঞ্চম সংশোধনী থেকেই আরম্ভ করা হয়েছিল। এমন প্রক্রিয়ায় সারা দেশে প্রচার চলছে যাতে তরুণ প্রজন্মের কাছে মনে হবে বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে হাইকোর্টের দুই সদস্যবিশিষ্ট বেঞ্চ পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে যেন সংবিধানকে পূত-পবিত্র করেছেন। পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসের ৪ তারিখে গণপরিষদে যে অবস্থায় সংবিধান গ্রহণ করা হয়েছিল, সেখানে ফিরে যাওয়া যেনো স্বয়ংক্রিয় ব্যাপার। জটিল বিষয়টি ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের স্বার্থে এভাবে সরলীকরণ করা যায় কি না, সেটি বোঝার জন্য সংবিধানের ২ ও ৩ নম্বর সংশোধনী নিয়ে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

আগেই উল্লেখ করেছি, দ্বিতীয় সংশোধনী একটি নিবর্তনমূলক আইন এবং মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান বিরুদ্ধ মত দমনের উদ্দেশ্যেই প্রধানত বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণয়ন করেছিলেন। বাংলাদেশের উভয় প্রধান দল বিগত দুই দশকে বহুবার এই আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রতিবার নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ কেউই তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি থেকে পুনর্বার বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও আওয়ামী লীগের দিন বদলের সনদ এ বিষয়ে নিশ্চুপ থেকেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে যত্রতত্র ইসলামি জঙ্গি আবিষ্কার করে বেড়াচ্ছে এবং বিগত দশ মাসে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মৌলিক অধিকারবিরোধী ধারাবলেই অসংখ্য মানুষকে আটক করেছে। আটক ব্যক্তিদের বেশির ভাগই পরে কথিত অভিযোগে আদালতে হয় নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে অথবা তাদের এখনো বিনা বিচারে আটকে রাখা হয়েছে। শেখ মুজিব হত্যা মামলার রায় ঘোষণা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সব প্রভাবশালী মন্ত্রীরা গত সপ্তাহখানেক ধরে যেভাবে দেশব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়েছেন, তার তুলনা মেলা ভার। এমতাবস্থায়, সরকারের হৃদয়ের যদি পরিবর্তন হয়ে থাকে এবং তারা বিবেচনা করে থাকেন দেশে বিশেষ ক্ষমতা আইনের প্রয়োজন ফুরিয়েছে এবং বাংলাদেশে ভবিষ্যতে কখনো জরুরি আইন ঘোষণা করতে হবে না, তাহলে দ্বিতীয় সংশোধনী বাতিল হতেই পারে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি না থাকা সত্ত্বেও একটি কালো আইন বাতিল করার জন্য শেখ হাসিনা এবং তার সরকার অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার হবেন।

এবার তৃতীয় সংশোধনী প্রসঙ্গ। সরকার দেশের মানচিত্র বদলের অপচেষ্টা করছে, এমন একটি মন্তব্য করে মাত্র কয়েক দিন আগেই বেগম খালেদা জিয়া সরকার দলীয় নেতৃবৃন্দের তোপের মুখে পড়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তো বিরোধীদলীয় নেত্রীর বিরুদ্ধে রীতিমতো দেশদ্রোহিতার অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। মামলা এবং রিমান্ডপ্রিয় সরকারের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছ থেকে এই গুরুতর অভিযোগ শুনে অনেকেই ধারণা করছিল এবার বোধ হয় বেগম খালেদা জিয়াকে আরো একটি মামলার ধাক্কা সামলাতে হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয় জানেন না নয়তো ভুলে গেছেন, প্রকৃতপক্ষেই সংসদে আইন করে বাংলাদেশের মানচিত্র একবার পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এই কর্মটি তার দলের প্রাণপুরুষ মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালেই ঘটেছিল। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের জ্ঞাতার্থে সংবিধানের তৃতীয় সংশোধনীর ৪ নম্বর অনুচ্ছেদটি উদ্ধৃত করছিঃ

‘‘এলাকা অন্তর্ভুক্ত ও বহির্ভূতকরণের বিজ্ঞপ্তি। চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যবর্তী ভূ-সীমানা নির্ধারণের পর সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তি দ্বারা সরকার যে তারিখ বর্ণনা করেন সেই তারিখ হইতে উক্ত বিজ্ঞপ্তিতে বর্ণিত ‘অন্তর্ভুক্ত এলাকা’ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার অংশ হইবে এবং ‘বহির্ভূত এলাকা’ উহার অংশ হইবে না।”
আর মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির যে অংশবলে সংবিধান সংশোধনক্রমে মানচিত্রের এই পরিবর্তন করা হয়েছিল সেটিও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের জানা আবশ্যক।

"১৪. Berubari.-India will retain the southern half of South Berubari Union No. 12 and the adjacent enclaves, measuring an area of 2.64 square miles approximately, and in exchange Bangladesh will retain the Dahagram and Angarpota enclaves. India will lease in perpetuity to Bangladesh an area of 178 meters x 85 meters near `Tin Bigha to connect Dahagram with Panbari Mouza (P.S. Patgram) of Bangladesh”
একবার যে গোষ্ঠী দেশের মানচিত্র বদল করতে পেরেছে সেই একই গোষ্ঠী প্রায় একদলীয় সংসদের সুযোগ নিয়ে দ্বিতীয়বার মানচিত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে পারে এমন সন্দেহ পোষণ করা হলে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা আখ্যা দেয়ার যুক্তি কোথায়? আর বাংলাদেশ যে তিন বিঘা করিডোরের আশায় বৃহৎ প্রতিবেশীর কাছে বেরুবাড়ী ছিটমহল হস্তান্তর করেছিল সেই করিডোরও তো lease in perpetuityÕk (চুক্তি থেকে উদ্ধৃত) ভিত্তিতে অদ্যাবধি পাওয়া যায়নি। চুক্তি ভঙ্গ করার কারণ হিসেবে আমাদের জানানো হয়েছে, ভারতের উচ্চ আদালত সাব্যস্ত করেছে এই তিন বিঘা করিডোর বাংলাদেশকে দেয়া হলে নাকি সে দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হবে। অথচ একই আধিপত্যকামী বৃহৎ দেশটি এখন বাংলাদেশকে চার ভাগে বিভক্ত করে শত শত কিলোমিটারব্যাপী করিডোর চাচ্ছে এবং ভারতের এ দেশীয় দালাল গোষ্ঠী তাদের প্রভু রাষ্ট্রের চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বে্‌ আমরা যারা বিশ্বাস করি তারা যখন এই ভারতীয় করিডোরের বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলেই অবস্থান নিয়েছি, তখন নানা রকম হয়রানির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ভারতের সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে সরকারপক্ষীয়দের যথেষ্ট সমবেদনা। অপরাধ কেবল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুললেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের বিজয়ের মাসে ভারত সফরে যাচ্ছেন। শুনতে পাচ্ছি এই সফরে নাকি নানা বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। আশা করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার সফররের সময় অপর পক্ষের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি বাস্তবায়ন না করতে পারার জন্য তাদের কাছ থেকে বেরুবাড়ী ফেরত চাওয়ার হিম্মত দেখাবেন। তা ছাড়া শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই বোঝেন, বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরতে হলেও তো আমাদের তৃতীয় সংশোধনী বাতিল করতে হবে। সেই কাজটি সোনিয়া গান্ধী ও ড. মনমোহন সিংহের অনুমতিসাপেক্ষে আমরা যত দিন না করতে পারছি তত দিন বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং বুদ্ধিজীবীদের মায়াকান্না বন্ধ রাখাটাই শ্রেয়। মাত্র দশ মাসের মধ্যে অনেক নাটকের মঞ্চায়নই তো দেখলাম। জনগণের ধৈর্যচ্যুতি ঘটার আগেই নতুন নতুন নাটক রচনা বাদ দিয়ে সাধারণ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে মনোযোগী হলেই সরকারের জন্য আখেরে কাজ দেবে।

লেখকঃ সাবেক জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা এবং বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান
(সুত্র, নয়া দিগন্ত, ১৯/১১/২০০৯)

ওরা মানুষ নয় ওরা শিবির

ইতিহাসে পড়েছি প্রাচীন ভারতে রাজন্যবর্গ অমাত্য, সৈন্যসামন্ত সমভিব্যহারে বন্যপ্রাণী শিকারে বের হতেন। সৈন্যসামন্তের কাজ ছিল দল বেঁধে শিকারটিকে তাড়িয়ে রাজার সামনে এনে দেয়া। রাজামশাই তারপর সেই শ্রান্ত-ক্লান্ত প্রাণীটিকে বধ করে তার অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করতেন। অপ্রয়োজনে বন্যপ্রাণী হত্যার মতো নিষ্ঠুর কাজে ব্যাপৃত থাকলেও তাদের রোমান্টিক মন আবার সুন্দরী রমণীদের খোঁজেও থাকত। বন-জঙ্গলে লালিত ঋষিকন্যার রাজার মন জয় করার চিত্তাকর্ষক কাহিনী অনেক পাঠকেরই জানা। গত ক�দিন ধরে বাংলাদেশে শিবিরকর্মী ধরতে যে তথাকথিত চিরুনি অভিযান চলছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই পুরাকালে রাজ-রাজড়াদের আনন্দ-মৃগয়ার গল্প মনে পড়ল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তার আদেশ শিরোধার্য করেই দেশের তাবত্ পুলিশকে দলীয় ঠ্যাঙারে বাহিনীর মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার লক্ষ্যে চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, শিবির ধরা অভিযানে ছাত্রলীগ কর্মীরা পুলিশকে সহায়তা করছে। পুলিশ এবং ছাত্রলীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই যৌথ অভিযান সংবিধানের কোন ধারা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে, তার জবাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীই ভালো দিতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী মহোদয় দেশ থেকে জামায়াত-শিবির একেবারে উত্খাতের ঘোষণা দিয়েছেন। এসব নির্দেশ এবং ঘোষণা যে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, �স্বাধীন আদালতের� যুগে সরকার তার পরোয়া করার কোনো প্রয়োজন বোধ করছে না। সংবিধানের আলোচনার আগে সরকারপন্থী মিডিয়ার ভূমিকা পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। শিবিরের বিরুদ্ধে পুলিশ-ছাত্রলীগের যৌথ অভিযান সম্পর্কে দুটি চিহ্নিত সংবাদপত্রের একই দিনের শিরোনাম যথাক্রমে��শিবির পালাচ্ছে� এবং �শিবিরের তাণ্ডব�। বাংলাদেশের একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে পত্রিকা দুটির শিরোনাম পড়ে আমি যারপরনাই বিভ্রান্ত হয়েছি। যে পালায় সে-ই আবার তাণ্ডব চালায় কী করে�এই ধাঁধার উত্তর আমার জানা নেই। অপসাংবাদিকতার একটা সীমা থাকা দরকার। উভয় পত্রিকাই সরকারের মুখপত্র হওয়ার প্রতিযোগিতায় রত এবং সম্পাদকদ্বয় মাস কয়েক আগেই দিল্লি সফর করে এসেছেন। যতদূর জানি, একটি পত্রিকার মালিকের ব্যাংকে বিপুল অংকের খেলাপি ঋণ সমস্যা রয়েছে এবং অন্য মালিক ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই�র প্রেসিডেন্ট পদটি পেতে আগ্রহী।

ক�দিন আগে টেলিভিশনের টকশো�তে বাংলাদেশের অপর এক প্রখ্যাত সম্পাদকের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মন্তব্য শুনে বিস্মিত হয়েছি। ভদ্রলোকের রাজনৈতিক আদর্শ যাই হোক না কেন, তাকে এতদিন মানবাধিকারের পক্ষশক্তি হিসেবেই বিবেচনা করতাম। তিনি বললেন, শিবিরের মানসিকতায় ঐতিহ্যগতভাবে যে মধ্যযুগীয় বর্বরতা রয়েছে তারই বহিঃপ্রকাশ নাকি ঘটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির কর্তৃক ছাত্রলীগ কর্মী হত্যার মধ্য দিয়ে। তিনি সম্ভবত হতভাগ্য ছাত্রটিকে কেবল হত্যা করেই ক্ষান্ত না হয়ে তার মৃতদেহ ম্যানহোলে ফেলে দেয়ার নির্মমতা লক্ষ্য করেই মন্তব্যটি করেছেন। কিন্তু, আমার বিবেচনায় সব হত্যাকাণ্ডই বর্বরতা। শিবির কাউকে হত্যা করলে সেই ঘটনাকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলব, আর ছাত্রলীগ অথবা ছাত্রদল একই নির্মমতা প্রদর্শন করলে সেটি ডিজিটাল অথবা আধুনিক হত্যাকাণ্ড হয়ে যাবে�এমন সরলীকরণের পক্ষে যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। রাজশাহীর একজন ছাত্রের হত্যাকাণ্ডকে যদি আমরা মধ্যযুগীয় বর্বরতা আখ্যা দেই, তাহলে ২৮ অক্টোবর দিনে-দুপুরে টেলিভিশন ক্যামেরা এবং শত শত পুলিশের সামনে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে তাদের মৃতদেহের ওপর উল্লসিত আওয়ামী লীগ কর্মীদের লাফালাফিকে সম্পাদক মহোদয় কী বিশেষণ দেবেন তা আমার জানা নেই। অথবা ইঙ্গ-মার্কিন জল্লাদ বাহিনী প্রায় এক দশক ধরে ইরাক এবং আফগানিস্তানে যে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, তাকে আমরা কী বলব? ইসরাইলি সামরিক বাহিনী প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীকে যে প্রক্রিয়ায় বিগত ষাট বছর ধরে হত্যা করছে, তাকেই বা কোন বিশেষণে অভিহিত করা হবে? ভারতীয় বাহিনী আমাদের সীমান্তে বছরের পর বছর ধরে যেভাবে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করে চলেছে, তাকে মধ্যযুগীয় বলব নাকি আধুনিক পদ্ধতিতে গুলি করে অথবা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা অভিহিত করে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাজনিত কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করব? ফ্যাসিবাদ নিয়ে যতটুকু পড়াশোনা করেছি তাতে জনপ্রিয় সম্পাদকের সেদিনের বক্তব্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি ফ্যাসিবাদেরই গন্ধ পেয়েছি। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানো এবং রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক তাদের ওপর নির্যাতনের পর সেটিকে বৈধতার প্রলেপ দেয়ার অপচেষ্টা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞাতেই পড়ে।

এবার বেচারা সংবিধানের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩৭ এবং ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদগুলো উদ্ধৃত করছি যাতে বর্তমান সরকারের সব মৌলিক অধিকার এবং দেশের প্রচলিত আইনবিরোধী কার্যকলাপের ভয়ঙ্কর চিত্রটি পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারেন :
�অনুচ্ছেদ-২৭ : আইনের দৃষ্টিতে সমতা।�সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
অনুচ্ছেদ-৩১ : আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার।�আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।
অনুচ্ছেদ-৩৭ : সমাবেশের স্বাধীনতা।�জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।
অনুচ্ছেদ-৩৮ : সংগঠনের স্বাধীনতা।�জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।�

বাংলাদেশ সরকার যেহেতু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার কোনো ঘোষণা দেয়নি, কাজেই উদ্ধৃত চারটি অনুচ্ছেদে প্রদত্ত অধিকার সংগঠনদ্বয়ের প্রতিটি নেতাকর্মী সংরক্ষণ করে। এই বাস্তবতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শিবির উত্খাতের ঘোষণা সংবিধান পরিপন্থী ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার জ্বলন্ত প্রমাণ। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই জাতীয় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ থাকলেও �স্বাধীন আদালতে� ন্যায়বিচার কতটা পাওয়া যায় তার অতি সাম্প্রতিক বিরূপ অভিজ্ঞতা আমারই রয়েছে। সে সম্পর্কে গতকালের আমার দেশ পত্রিকায় একটি সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। সংবিধান, আইন ও আদালতের কোনো তোয়াক্কা বর্তমান সরকার যে করে না তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আরও একটি বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, �রাজশাহীতে আমাদের এক ভাইকে খুন করেছে। অনেকের হাত-পায়ের রগ কেটে দিয়েছে। শিবির সারাদেশে ছাত্রলীগের ভাইদের হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরকে আর ছাড় দেয়া হবে না। তাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।� জার্মানির এডলফ্ হিটলার যখন সেদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলের জন্য কমিউনিস্টবিরোধী এবং ইহুদিদের বিরুদ্ধে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান (Ethnic Cleansing) চালিয়েছিলেন, ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের মুখে অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের মতোই ভাষা পাওয়া যাবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যে কোনো ছাত্রই রাইখস্ট্যাগের সাজানো নাটক সম্পর্কে পড়েছেন। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিটলারের আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত কিনা সেই তথ্য অবশ্য আমার অজানা। তবে, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কয়েকটি প্রশ্ন না করে পারা যাচ্ছে না। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যকার সব পুরুষ প্রজাতিকে আপনি যে ভাই হিসেবে বিবেচনা করেন সেটি অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। প্রশ্ন হলো, দলনিরপেক্ষ এবং বিরোধী মতের সবাইকে আপনি বৈমাত্রেয় ভাই বা বোন বিবেচনা করে তাদের প্রতি আজন্মলালিত কোনো আক্রোশ অনুভব করেন কি-না? নইলে দরিদ্র পরিবারের সন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবুবকর যখন আপনার ভাইদের আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধের বলি হয়, সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে আপনি উপহাস করেন কী করে? তখন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আপনার চিরুনি অভিযান কোথায় যায়? মন্ত্রীর শপথ গ্রহণ করার সময় আপনি নিশ্চয়ই উচ্চারণ করেছিলেন, �কোনো অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হইয়া আমি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিব না।� রাজশাহী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই প্রকৃতির হত্যাকাণ্ডে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মাধ্যমে আপনি সেই শপথ ভঙ্গ করেছেন কি-না? সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে সব নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে যে সমান ঘোষণা করা হয়েছে, সংবিধানের সেই নির্দেশনা আপনি মান্য করেন কি-না?

বাংলাদেশে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বাকশাল আমল ছাড়া সর্বকালের সীমা অতিক্রম করলেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধ্বজাধারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং এদেশীয় দালালশ্রেণী কেবল নীরবতাই অবলম্বন করছে না , উপরন্তু, তাদের মুখপত্রগুলো এই অন্যায় আচরণকে বৈধতা দেয়ার নির্লজ্জ চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে পুরনো আহমদিয়া ইস্যুর কথা মনে পড়ে গেল। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে একদল অতি বিপ্লবী ইসলামপন্থীর আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে কিছুদিন পরপরই বেশ বড় বড় জঙ্গি বিক্ষোভ মিছিল বের করে ওদের উপাসনালয়ে আক্রমণের চেষ্টা চালাত। চারদলীয় জোটের পুরোটা সময় ধরেই এই আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড চালালেও বিগত সাড়ে তিন বছর তারা এক প্রকার পর্দার অন্তরালেই অবস্থান করছে। সেই সময় কে তাদের অর্থায়ন এবং পৃষ্ঠপোষকতা করত, সেই রহস্যের আজও কিনারা হয়নি। যাই হোক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এই আহমদিয়া ইস্যুটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল এবং সেই সময় সরকারের সঙ্গে মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু সংক্রান্ত যে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনায় তারা অবধারিতভাবে আহমদিয়া প্রসঙ্গ উত্থাপন করত। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর কর্তাব্যক্তিদের বাংলাদেশ সফরের সময় আহমদিয়াদের উপাসনালয়ে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেয়াটা নির্দিষ্ট রুটিনে পরিণত হয়েছিল। আগেই উল্লেখ করেছি, এখন আর দেশে আহমদিয়াবিরোধী আন্দোলনের কোনো নাম-নিশানা নেই। তবে সরকার সম্প্রতি যে চণ্ডমূর্তি ধারণ করে জামায়াত-শিবিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, সেটি এদেশে এক নতুন অভিজ্ঞতা।

দেশের অধিকাংশ সংবাদপত্র সরকারপন্থী হওয়ার সুযোগে মানবাধিকারকে পদদলিত করতে প্রশাসনের কোনো সমস্যাই পোহাতে হচ্ছে না। যে একটি-দুটি পত্রিকা নিতান্তই ব্যতিক্রম হিসেবে এই দমননীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ক্ষমতাসীনদের নির্যাতন অথবা দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করার ঝুঁকি নিচ্ছে, তারাই রাষ্ট্রযন্ত্রের সব ধরনের দমন-পীড়নের শিকারে পরিণত হচ্ছে। ইঙ্গ-মার্কিন-ভারত-ইসরাইল কৌশলগত মৈত্রী যতদিন অব্যাহত থাকবে ততদিন বাংলাদেশের ভারতপন্থী সরকারের এসব অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কোনো প্রতিবাদ আসার সম্ভাবনা আমি অন্তত দেখি না। সেরকম কোনো আশঙ্কা থাকলে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (Bangladesh Development Forum) ঢাকা বৈঠকের সময় দেশকে এ ধরনের অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে নেয়ার ঝুঁকি কোনো অবস্থাতেই নিত না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এ জাতীয় আন্তর্জাতিক বৈঠকের প্রাক্কালে সরকার পারতপক্ষে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চায় না। সব বিবেচনাতেই আমরা এক ব্যতিক্রমধর্মী সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে পাচ্ছি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দিন যে সত্যিই বদল করতে পেরেছে, তাতে আর সন্দেহ কী?

জনগণের জন্য অধিকতর বিপদের কারণ হলো, প্রধান বিরোধী দলও অনেকটা আপস করেই কোনোক্রমে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করার কৌশল গ্রহণ করেছে। এতদিন সংসদ বর্জন করে বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকের ঠিক দিন কয়েক আগে সংসদে প্রত্যাবর্তনের আকস্মিক সিদ্ধান্ত কেন তারা গ্রহণ করলেন তা তারাই ভালো জানেন। তবে কেবল বিদেশিদের সন্তুষ্টি অর্জন অথবা তাদের সহানুভূতি কুড়ানোর জন্যই যদি বিনাশর্তে এই ছাড় দেয়া হয়ে থাকে তাহলে এর মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের রাজনৈতিক দীনতা, অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এবং জনগণের শক্তির ওপর আস্থাহীনতা প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি দলের শিষ্টাচারবহির্ভূত, অসংসদীয় আচরণ অব্যাহত রাখা দেখে দেশবাসী এটাও বুঝতে পেরেছে যে, ক্ষমতাসীনরা বিরোধী পক্ষকে শক্তিহীন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনা করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিদিন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদে যাচ্ছেন এবং তাদের জীবিত অথবা মৃত শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশে সরকারি দলের অবমাননাকর কুত্সা হজম করে ওয়াক আউট করছেন, পরের দিনের একই নাটকে অংশ নেয়ার জন্য। এর ফলে তারা যে জনগণের কাছে নিজেদের ক্রমেই হাসির পাত্র করে তুলছেন সে বিষয়টি নীতিনির্ধারকরা বোঝেন কিনা আমার জানা নেই। ক্ষমতাসীনদের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিবাদী প্রবণতা জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এবং রাজপথের আন্দোলন ছাড়া যে রোখা যাবে না, এই সহজ সত্যটি বিরুদ্ধ মতাবলম্বীরা যত দ্রুত উপলব্ধি করবেন ততই দেশের মঙ্গল। পৃথিবীর ইতিহাসে যে কোনো আপসকামিতা বার বার ফ্যাসিবাদকেই উত্সাহিত করেছে। উটের মতো বালিতে মাথা গুঁজে আত্মরক্ষা কিংবা দেশরক্ষা শেষ পর্যন্ত কোনোটাই হবে না।

[সুত্র, আমারদেশ, ১৬/০২/২০১০]

আওয়ামী লীগ-স্বৈরতন্ত্র সংযোগের ইতিহাস

আওয়ামী লীগ তার দলীয় বুদ্ধিজীবী এবং মিডিয়ার সহায়তাক্রমে গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের প্রশ্নে সর্বদা উচ্চকণ্ঠে তাদের দলের কথিত আদর্শিক অবস্খান দাবি করতে অভ্যস্ত। দীর্ঘ তিন দশক ধরে বাংলাদেশের অপর প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে ক্যান্টনমেন্টে সৃষ্ট এবং মৌলবাদের সহায়তাকারী হিসেবে প্রচার করে দলটি জনমতকে প্রভাবিত করে যথেষ্ট রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে যে পেরেছে, সেটি অস্বীকারের উপায় নেই। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ক্ষমতাসীন দলটির মানসিকতায় নীতি কিংবা আদর্শের কোনো বালাই কখনো ছিল না এবং এখনো নেই। ১৯৯৬ সালে তারা জামায়াতে ইসলামীর সাথে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে জয় লাভ করেছিল এবং ২০০৭ সালের স্খগিত নির্বাচনের আগে শায়খুল হাদিসের দলের সাথে বাংলাদেশে ফতোয়াকে বৈধতাদানসহ একপ্রকার ইসলামি শাসনব্যবস্খা প্রবর্তনের পাঁচ দফা চুক্তিও সই করেছিল। তদুপরি ঐতিহ্যগতভাবেই স্বৈরাচারী মানসিকতার দলটির মধ্যে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের লেশমাত্র নেই। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাধীনতার ঘোষক, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, সেক্টর কমান্ডার, বীর-উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিয়াউর রহমান সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও অন্য নেতৃবৃন্দ যেসব অশালীন বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছেন তাতে তাদের পুরনো ফ্যাসিবাদী চরিত্রেরই প্রতিফলন ঘটছে। ইসলাম ধর্ম মানলে মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করার সময় অভব্য বাক্য ব্যবহার পরিহার করাই কাঙ্খিত। কিন্তু সংসদে দাঁড়িয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং তার ফুফাতো ভাই শেখ সেলিম বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতার মৃতদেহ নিয়ে দিনের পর দিন যা করে যাচ্ছেন তার যথোপযুক্ত নিন্দা জানাতে হলে যে ভাষা প্রয়োগ করা আবশ্যক সে রকম ভাষা ব্যবহারে আমি অভ্যস্ত নই। আজ কলম হাতে নেয়ার উদ্দেশ্যও সেটি নয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের যে যোগাযোগ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি সেই কাহিনী প্রাসঙ্গিক দালিলিক প্রমাণসহ নতুন প্রজন্মকে জানানোই এই কলাম লেখার মূল উদ্দেশ্য।
মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাস পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে পদার্পণ করেন। দেশবাসী তাকে বরণ করে নেয় পরম মমতা এবং উজাড় করা ভালোবাসার উপঢৌকন নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বন্দিশালায় থেকেও সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ঐক্যের প্রতীক শেখ মুজিবুর রহমানের সুস্খ শরীরে স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তনের আনন্দ ও আবেগে আপ্লুত আমার মরহুম নানা তিনটি নফল রোজা রেখেছিলেন, সেই ঘটনা এখনো স্মৃতিপটে জাগরূক হয়ে আছে। আবার মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে সেই নানাকেই পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর এক ফোঁটা অশ্রুও যে ফেলতে দেখিনি, তা-ও বা ভুলি কী করে? যা হোক, ইসলামাবাদের শৃঙ্খলমুক্ত সাড়ে সাত কোটি বাংলাদেশী শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তনের দিন থেকে তারই নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণের কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণের স্বপ্ন দেখেছিল। দরিদ্র বাংলাদেশে কৃচ্ছন্সসাধনের অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন মুজিব সরকার কর্তৃক রাতারাতি কমিয়ে দেয়া হলে তারা সহাস্যে দেশের জন্য সেই ত্যাগ স্বীকারে সম্মত হয়েছিলেন। বছর না পেরোতেই অবশ্য স্বপ্নভঙ্গের পালাও শুরু হয়েছিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অত্যাচার এবং সর্বগ্রাসী দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ, অর্ধভুক্ত জনগণের ক্রমেই ফুঁসে ওঠা রুদ্ররোষকে নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হিসেবে একদা গণতন্ত্রমনস্ক শেখ মুজিব ক্রমেই একনায়কে রূপান্তরিত হতে লাগলেন। রক্ষীবাহিনী গঠন করে নির্বিচারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো, ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বñর সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী আনয়ন করে নিবর্তনমূলক জরুরি আইন জারির ব্যবস্খা হলো এবং সর্বশেষ ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কুখ্যাত চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্খা ‘বাকশাল’ চেপে বসল বাংলাদেশের অসহায়, নিরন্ন জনগণের কাঁধে। চতুর্থ সংশোধনীর ১১৭ ক (১, ২, ৩ ও ৪) অনুচ্ছেদ পড়লে এত বছর পরও তৎকালীন নেতৃত্বের স্বৈরাচারী মন-মানসিকতায় আতঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না।
‘১১৭ ক। জাতীয় দল। ১) রাষ্ট্রপতির নিকট যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে এই সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে বর্ণিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহের কোন একটা পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করিবার উদ্দেশ্যে অনুরূপ করা প্রয়োজন, তাহা হইলে তিনি আদেশ দ্বারা নির্দেশ দিতে পারিবেন যে রাষ্ট্রে শুধু একটা রাজনৈতিক দল (অত:পর জাতীয় দল নামে অভিহিত) থাকিবে।
২) যখন (১) দফার অধীন কোন আদেশ প্রণীত হয়, তখন রাষ্ট্রের সকল রাজনৈতিক দল ভাঙ্গিয়া যাইবে এবং রাষ্ট্রপতি জাতীয় দল গঠন করিবার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন।
৩) জাতীয় দলের নামকরণ, কার্যসূচি, সদস্যভুক্তি, সংগঠন, শৃঙ্খলা, অর্থসংস্খান এবং কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কিত সকল বিষয় রাষ্ট্রপতির আদেশ দ্বারা নির্ধারিত হইবে।
৪) (৩) দফার অধীন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রণীত আদেশ-সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন ব্যক্তি জাতীয় দলের সদস্য হইবার যোগ্য হইবেন।’
একজনমাত্র ব্যক্তির একটি দেশের এভাবে রাতারাতি হর্তা-কর্তা-বিধাতা সেজে বসার তুলনা কেবল জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনি এবং স্পেনের ফন্সাঙ্কোর সাথেই হতে পারে। ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামক একটিমাত্র রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে অন্য সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। তারপর একই বছর ১৫ জুন চারটিমাত্র পত্রিকা সরকারের মুখপত্র হিসেবে রেখে দেশের বাকি সব পত্রপত্রিকার অনুমোদন বাতিল করা হয়। সংসদীয় ক্যু-দেতার এমন মন্দ উদাহরণ বিশ্বে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া কঠিন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত গণতন্ত্রের জন্য অবিরাম লড়াইরত শেখ মুজিবুর রহমানের এমন ভয়ানক স্বৈরশাসকে রূপান্তর সমগ্র জাতির জন্যই চরম দুর্ভাগ্য ডেকে এনেছিল। আওয়ামী লীগের মননে সেই যে স্বৈরতন্ত্রের অনুপ্রবেশ, তারপর থেকে দলটি আর কোনো প্রকার গণতান্ত্রিক আচরণে প্রত্যাবর্তন করতে তো পারেইনি, বরং তৎপরবর্তী দেশের সব অসাংবিধানিক পদক্ষেপে কোনো না কোনোভাবে জড়িত থেকেছে।
প্রথমেই যে সামরিক আইন ফরমানের দায়দায়িত্ব আওয়ামী প্রচারযন্ত্র মরহুম জিয়াউর রহমানের ওপর সফলভাবে চাপিয়ে তিন দশক ধরে মৃত মানুষটিকে অব্যাহত দোষারোপ করে যাচ্ছে, সে দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। পাঠকের বোঝার সুবিধার জন্য ওই ফরমানের প্রথম আট লাইন উদ্ধৃত করছি­
"WHEREAS : the whole of Bangladesh has been under Martial Law since the 15th day of August, 1975; And WHEREAS Khandaker Mostaque Ahmed, who placed the country under Martial Law, has made over the Office of President of Bangladesh to me and I have entered upon that office on the 6th day of November, 1975; AND WHEREAS in the interest of peace, order, security, progress, prosperity and development of the country, I deem it necessary to keep in force the Martial Law proclaimed on the 15th August, 1975;"
(যেহেতু সমগ্র বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে সামরিক আইনের অধীনে আছে :
এবং যেহেতু খন্দকার মোশতাক আহমেদ, যিনি রাষ্ট্রকে সামরিক আইনের অধীনে নিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব আমার ওপর অর্পণ করেছেন এবং আমি সেই দায়িত্বভার ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে গ্রহণ করেছি; এবং যেহেতু দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা, অগ্রগতি, সাফল্য এবং উন্নয়নের স্বার্থে, আমি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে ঘোষিত সামরিক আইন অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি;)
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যে খন্দকার মোশতাক সামরিক আইন জারি করেছিলেন, তিনি বাকশাল সরকারের মন্ত্রী ছিলেন এবং তৎকালীন সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী প্রধান তিনজনই বিনা প্রতিবাদে মোশতাক সরকারের নিকট সম্পূর্ণ আনুগত্য জানিয়েছিলেন। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার বর্তমান সরকারেরই পরিকল্পনামন্ত্রী। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়েছিলেন জেনারেল খালেদ মোশাররফ, যিনি ওই মাসেরই ৩ নভেম্বর সামরিক অভ্যুথানের মাধ্যমে মাত্র ৭২ ঘন্টার জন্য রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা হতে পেরেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর প্রত্যুষ পর্যন্ত জেনারেল জিয়া সপরিবারে গৃহবন্দী ছিলেন। ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করা হয় এবং ৮ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বিচারপতি সায়েম জারিকৃত উপরোল্লিখিত সামরিক ফরমানের বলে তাকে সেনাপ্রধান ও উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। একই ফরমানে কমোডর এম এইচ খান ও এয়ারভাইস মার্শাল এম জি তাওয়াবকেও যথাক্রমে নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান এবং উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। সুতরাং ১৯৭৫ সালের ঘটনাবহুল ৮৩ দিনে যে তিন দফা সামরিক আইন জারি এবং সংশোধন করা হয়, তার সাথে জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং আওয়ামী লীগ সমর্থনকারী জেনারেল খালেদ মোশাররফকেই এসব ঘটনার সাথে জড়িত পাওয়া যাচ্ছে। জেনারেল জিয়া অবশ্যই পরবর্তীকালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ গ্রহণ করেছিলেন, তবে সেটি ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর। অত:পর ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পঞ্চম সংশোধনী গ্রহণের মাধ্যমে দেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্খায় প্রত্যাবর্তন করে। সে দিক দিয়ে বিচার করলে পঞ্চম সংশোধনীকে দেশ থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহারের অপরিহার্য সহায়ক দলিল (instrument) হিসেবে বিবেচনা করাই অধিকতর সঙ্গত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অথচ কেবল প্রচারণার জোরে বাংলাদেশের জনগণের এক বৃহৎ অংশকে আওয়ামী লীগ বিভ্রান্ত করে এমন একটি ধারণা দিতে পেরেছে যে, তারা মনে করছেন পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়াই সামরিক আইন জারি করেছিলেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট দীর্ঘ ৩১ বছর পর সম্প্রতি পঞ্চম সংশোধনীকে কিছু সংশোধন ও পর্যবেক্ষণসহ (অবশ্য এই কলাম লেখা পর্যন্ত সেই সংশোধন কিংবা পর্যবেক্ষণ কোনোটাই জাতিকে জানানো হয়নি) বাতিল করে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বহুল আলোচিত উপরিউক্ত রায় যেহেতু আজকের লেখার মূল প্রসঙ্গ নয়, কাজেই এই বিষয়ে অতিরিক্ত কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলাম। এ দেশে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের ইতিহাস পর্যালোচনায় ফেরা যাক।
স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘতম স্বৈরাচারী শাসনকালের শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ। জেনারেল এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সে দিন মসনদে আসীন হয়েছিলেন। তার এই অসাংবিধানিক পদক্ষেপকে সাথে সাথে স্বাগত জানিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সে দিনও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, এ দেশে স্বৈরাচারের প্রতিভূ এই একনায়ক দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর ক্ষমতায় যে টিকে ছিলেন সেটি সম্ভব হয়েছিল শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সরাসরি মদদে। আশির দশকের একেবারে শেষ দিকে ঢাকা বিশñবিদ্যালয়ে জেনারেল এরশাদ সরকারের পতনের লক্ষ্যে স্বৈরাচারবিরোধী সর্বদলীয় ছাত্রমোর্চা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে সব রকম প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। মোর্চা গঠনে উৎসাহী ভূমিকা রাখার অপরাধে তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিবের পরবর্তীকালে আর ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগে ঠাঁই হয়নি। ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মেই সেই স্বৈরাচারী এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সমন্বয়েই গঠিত হয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোট। গত বছর ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার পতন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী জেনারেল এরশাদকে ইতিহাসের সর্বনিকৃষ্ট স্বৈরাচার বলে গাল দিয়েছেন। একদা শেখ মুজিবের কঠোর সমালোচনাকারী এই বামপন্থী নেত্রীর এরশাদ সম্পর্কিত বক্তব্যকে অবশ্য পাতানো খেলার অংশ ছাড়া মহৎ কিছু বিবেচনার সুযোগ নেই। এরপর ১৯৯৬ সালে জেনারেল নাসিমের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুথান। সেই সময়ের পত্রপত্রিকা ঘাঁটলে দেখা যাবে, সেই অভ্যুথান প্রচেষ্টার পেছনেও আওয়ামী লীগের নৈতিক, রাজনৈতিক এবং লজিস্টিক সমর্থন ছিল। জেনারেল নাসিমের অভ্যুথান ব্যর্থ করে সাংবিধানিক সরকার রক্ষায় ভূমিকা রাখার অপরাধে অন্য একটি মামলায় বর্তমানে কারারুদ্ধ সাবেক এনএসআই ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) রহিম, এক-এগারোর কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত মেজর জেনারেল (অব:) মতিন এবং তৎকালীন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল (অব:) ইমামুজ্জামান এই জমানায় নানা রকম হয়রানি ও ব্যক্তিগত বিপদের মধ্যে রয়েছেন। এ দেশে সর্বশেষ সফল এবং নতুন কিসিমের সামরিক অভ্যুথান সংঘটিত হয়েছে জেনারেল (অব:) মইনের নেতৃত্বে, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। সেই অভ্যুথান যেমন আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল ছিল, একইভাবে মহাজোট সরকারও সেই অভ্যুথানেরই ফসল। এক-এগারোর সরকার এবং দিন বদলের সরকারকে একে অপরের পরিপূরক বললে আশা করি পাঠক তাকে অত্যুক্তি বিবেচনা করবেন না। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের সংযোগের যে হাইপোথিসিস নিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম তথ্য ও যুক্তি দিয়ে তা কতখানি প্রমাণ করতে পারলাম সেটি পাঠক বিচার করবেন।
বাংলাদেশের অশান্ত ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের উপাদানগুলো নিম্নরূপ :
০১. ফ্যাসিবাদী একদলীয় শাসনব্যবস্খার দর্শনে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ। ০২. এ দেশে স্বৈরাচারের সর্বজনগ্রাহ্য উদাহরণ জেনারেল এরশাদ ও তার দল। ০৩. ১৯৯৬ সালের জেনারেল নাসিমের ব্যর্থ অভ্যুথানের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা। ০৪. এক-এগারোর কুশীলবরা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে।
সুতরাং ডিজিটাল নির্বাচনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী এবং ফ্যাসিবাদী মানসিকতাসম্পন্ন যে শাসক শ্রেণী প্রায় একদলীয় সংসদ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে, তাদের কাছ থেকে কোনো গণতান্ত্রিক আচরণ প্রত্যাশা করাই মূর্খামি। এই সরকারের অধীনে পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্খায় মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে, বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে অশ্রুপাত করবে, ভিন্ন মত দমন-পীড়নের শিকার হবে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবলুপ্ত হবে­ এটাই স্বাভাবিক। বর্তমান অবস্খায় আমিও আর কত দিন লেখালেখি করতে পারব তা-ও অনিশ্চিত। তবে এক-এগারোর তাঁবেদার সরকারের বিরুদ্ধে কলম ধরার দিন থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের সব ধরনের নির্যাতন সইবার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছি। অগণিত নারী-পুরুষের চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা রক্ষায় যদি আমার দুর্বল রচনাগুলো কোনো ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলেই নিজেকে ধন্য মনে করব। অত্যাচারী শাসক শ্রেণী জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে এক সময় পরাজিত হবে, এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। বাংলাদেশেও ফ্যাসিবাদের অতীত পরিণতি সুখকর হয়নি। এবারো ইনশাআল্লাহ, জনগণই জয়ী হবে।
লেখক : সাবেক জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা এবং বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ১৭/০২/১০]

ক্রুসেডের লক্ষ্য এখন বাংলাদেশ

এগার শতকের শেষ দশক থেকে পরবর্তী প্রায় দু�শ� বছর ধরে ইউরোপীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে লাগাতার যুদ্ধ চালিয়ে গেছে তাকেই ক্রুসেড নামে অভিহিত করা হয়েছে। ১০৯৫ সালে পোপ উরব্ান-২ (Pope Urban II) বাইজেনটাইন সম্রাট এলেক্সিয়াস-১ (Emperor Alexius I)-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইউরোপের প্রধানত লাতিন খ্রিস্টানদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী গঠন করে প্রথম তুর্কি সেলজুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে অবতীর্ণ হন এবং শেষ পর্যন্ত ১০৯৯ সালে তখন পর্যন্ত মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণাধীন পবিত্র জেরুজালেম নগরী অধিকার করতে সক্ষম হন। প্রকৃতপক্ষে মুসলমানের অর্ধচন্দ্রের (Crescent) বিরুদ্ধে খ্রিস্টীয় ক্রসের (Cross) যে আগ্রাসন তাকেই লাতিন ইউরোপ ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ নাম দিয়ে মধ্যযুগে ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এসব তথাকথিত ধর্মযুদ্ধ তত্কালীন সময়ে খ্রিস্টান ধর্মগুরু পোপের অনুমোদন ও নির্দেশক্রমেই পরিচালনা করা হতো। প্রথম ক্রুসেডে মুসলমানরা জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত হলেও ১১৮৭ সালের তৃতীয় ক্রুসেডে সুলতান সালাদিনের নেতৃত্বে মুসলমান বাহিনী জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করে। ক্রুসেডের হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস বর্তমান দশকে নতুন করে প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে। নবরূপে ক্রুসেডের ধারণার সূত্রপাত অবশ্য ১৯৯৩ সালে স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তার সভ্যতার সংঘাত (Clash of Civilizations) তত্ত্বের মাধ্যমেই করে গেছেন। গত এক দশক ধরে আফগানিস্তান ও ইরাকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী যৌথবাহিনীর যে আগ্রাসন চলছে সেটি মূলত মধ্যযুগীয় ক্রুসেডেরই আধুনিক সংস্করণ মাত্র। ২০০১ সালে মার্কিনিদের যুদ্ধ প্রস্তুতিকালীন সময়ে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ক্রুসেড শব্দটি একবার উচ্চারণও করেছিলেন। আন্তর্জাতিক মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে তার উপদেষ্টারা আর দ্বিতীয়বার তাকে ওই শব্দটি উচ্চারণ করতে না দিলেও স্বঘোষিত Born again Christian জর্জ বুশ (জুনিয়র) যে বর্তমান বিশ্বকে ক্রুসেডের আলোকেই দেখে থাকেন এটা তার সামগ্রিক বক্তব্য, আচার-আচরণে পরিষ্কার। স্ক্যানডিনেভিয়াভুক্ত রাষ্ট্রসমূহসহ আধুনিক ইউরোপের অনেক দেশেই ইসলাম বিরোধিতা ক্রমেই প্রকট রূপ ধারণ করছে। ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্রের ইসলামবিদ্বেষীরা রীতিমত উন্মাদের মতো আচরণ করছে। ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু বর্তমান পোপ বেনেডিক্ট-১৬ তার প্রকাশ্য ইসলামবিরোধী বক্তব্যের জন্য কিছুদিন আগেও যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছেন। বিশ্ব রাজনীতির উপরোক্ত বাস্তবতার আলোকে এবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

আমার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র মুসলমান প্রধান রাষ্ট্র যেখানে সরকারি মদতে গণমাধ্যমে অবিরত ইসলামবিরোধী কুিসত প্রচার চালানো হয়। আমাদের জাতীয় দিবসগুলোতেও ঐক্যের বাণী প্রচারের পরিবর্তে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো হয়ে থাকে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই দুষ্কর্মটি যারা করে থাকেন তাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আবার মুসলমান পরিবার থেকেই এসেছেন এবং পিতৃ প্রদত্ত মুসলমান নাম ধারণ করেই আছেন। পিতা-মাতার ধর্মবিশ্বাসের প্রতি এই অপরিসীম বিরাগ সৃষ্টির পেছনে ঠিক কোন দর্শন কাজ করেছে তা আমার জানা নেই। তবে বাংলাদেশকে যে একটি শ্রেণী মুসলমানপ্রধান, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আর দেখতে চায় না, সেটি ক্রমেই প্রমাণিত হচ্ছে। তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একাধারে বীরত্বপূর্ণ ও ট্র্যাজিক ঘটনাবলীকে দীর্ঘদিন ধরে সাফল্যের সঙ্গে তাদের উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চলেছে। পশ্চিম পাকিস্তানের পুঁজিপতি, সামন্তবাদী গোষ্ঠী ও সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামকে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চললেও দৃশ্যত প্রচারণার তীব্রতা বেড়েছে নব্বইয়ের দশক থেকে। স্যামুয়েল হান্টিংটনের চরম ইসলামবিদ্বেষী সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের উদ্ভবও যে প্রায় একই সময়ে হয়েছে এই বিষয়টিকে কেবল কাকতালীয় ভেবে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। আগেই বলেছি হাজার বছর আগে ইসলামিক ক্রিসেন্টকে মোকাবেলা করার জন্যই খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা ক্রুসেড আবিষ্কার করেছিলেন। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে নির্যাতনকারী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্বল্পসংখ্যক এ দেশীয় দালালগোষ্ঠী মুসলমান ধর্মাবলম্বী হওয়ার বিষয়টিকে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বর্তমান দোসররা সুযোগ হিসেবে নিয়ে ইসলামের সব প্রতীককে জনগণের কাছে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে চলেছে।

ইসলামের আদিযুগ থেকেই চাঁদ-তারা ইসলামী আন্দোলনের প্রতীক রূপে এই ধর্মাবলম্বীদের পতাকায় প্রদর্শিত হয়ে আসছে। এই প্রতীক কিংবা সবুজ রং পাকিস্তানের পতাকায় আছে বলেই এগুলো সে দেশটির সম্পত্তি হয়ে যায়নি। প্রসঙ্গক্রমে, সমাজতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে অনেক দেশেই যে কাস্তে-হাতুড়ি ব্যবহারের রেওয়াজ রয়েছে সেটিও পাঠক জানেন। মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় রং ছিল সবুজ এবং অনেক হাদিসে সবুজকে বেহেস্তিদের পোশাকের রং হিসেবে বর্ণনা করা আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো পবিত্র কোরআন শরীফের সূরা আদ দাহার-এর ২১ নম্বর আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ্তায়ালা জান্নাতবাসীদের পোশাকের যে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন তা নিম্নরূপ :

�তাদের আবরণ হবে চিকন সবুজ রেশম ও মোটা সবুজ রেশম।�
দাড়ি রাখা ইসলাম ধর্ম পালনে অপরিহার্য না হলেও আমাদের প্রিয় নবী যেহেতু দাড়ি রাখতেন, কাজেই এটি আমরা সুন্নত হিসেবেই পালন করে থাকি। নামাজ আদায় করার সময় টুপি পরে মাথা ঢেকে রাখাও আমাদের ধর্ম পালনেরই রীতি। মস্তক আবৃত করার এই রীতি অন্যান্য সেমেটিক ধর্মেও রয়েছে। ইহুদি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এক বিশেষ ধরনের টুপি (Skull Cap) পরাকে তাদের ধর্ম পালনের অত্যাবশ্যকীয় আচার বলেই মনে করে। খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা যথেষ্ট জাঁকজমকপূর্ণ টুপি পরেই রোববার চার্চে ধর্মোপদেশ প্রদান করে থাকেন। অথচ, বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমে আজ যুদ্ধাপরাধীর কল্পিত চেহারা দেখাতে গিয়ে মুখে দাড়ি এবং মাথায় সবুজ রংয়ের চাঁদ-তারাখচিত টুপি পরিহিত এক রক্তলোলুপ, বীভত্স দানবকে তরুণ প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করছে। পশ্চিমা মিডিয়াতেও সবুজ রংকে সচরাচর নেতিবাচকভাবেই প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। হলিউডের অধিকাংশ ছবিতে শয়তানকে (Devil) সবুজ দেহাবরণবিশিষ্ট দেখানো হয়। এ দেশেও রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী দেখানোর নামে ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট উভয় মিডিয়াতেই ইসলামের চিহ্নসমূহকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের মতো করেই নেতিবাচকভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে। এদিকে আবার সরকারের সব মহল থেকেও টুপি, দাড়ি এবং হেজাবকে জঙ্গিবাদের চিহ্ন হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কট্টর সাম্রাজ্যবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী জর্জ বুশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একজন স্বঘোষিত সাথী। মন্ত্রিসভায় তার সহকর্মী, আইনমন্ত্রী বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাগুলোকে জঙ্গিবাদের প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ইসলাম ধর্মকে জঙ্গিবাদের জন্য দায়ী করে বক্তব্য দেয়ার পরও স্বপদে বহাল রয়েছেন। সরকার এবং তাদের সমর্থকদের কার্যকলাপে মনে হতে পারে অন্তত এদেশে ইসলামকে পরাজিত করতে এক হাজার বছর আগের মতো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের আর কষ্ট করার দরকার নেই, বাংলাদেশে ক্রুসেড পরিচালনার দায়িত্ব এদেশের মুসলমান নামের লেবাসে ইসলামবিরোধীরাই গ্রহণ করেছে। সরকার এবং তাদের সমর্থক গণমাধ্যমের অবস্থান হলো, জামায়াতে ইসলামী এ দেশে রাজনীতি করতে পারবে না, কারণ তারা যুদ্ধাপরাধী; হিযবুত তাহরিরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে কারণ তারা সরকারের বিবেচনায় জঙ্গি; দেশ থেকে কওমী মাদ্রাসা উঠিয়ে দিতে হবে, কারণ আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী সেখানে জঙ্গি প্রজনন কারখানা রয়েছে। সোজা কথা, ইসলাম ধর্মের আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনীতি বাংলাদেশে করতে দেয়া হবে না। এ সবই বিদেশি প্রভুদের নির্দেশে ও তাদের সন্তুষ্টির জন্যই করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় বিএনপির নীতিনির্ধারকরা যদি আশা করে থাকেন যে, পশ্চিমারা বর্তমান সরকারের মতো অনুগত মিত্র ত্যাগ করে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে সমর্থন করবে তাহলে তারা এখনও বোকার স্বর্গে বাস করছেন। জামায়াতে ইসলামীও দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন তোষণ নীতি অনুসরণ করার ফল এখন ভালোভাবেই ভোগ করছে। বাংলাদেশের জনগণের উপলব্ধি করা প্রয়োজন, সপরিবারে শেখ মুজিব হত্যার জন্য আওয়ামী লীগ এক সময় সিআইএ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শেখ হাসিনার কোনো সমস্যা হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও একদা সোভিয়েতপন্থী আওয়ামী লীগকে বুকে টেনে নিয়েছে একবিংশ শতাব্দীর ক্রুসেডের সাথী হিসেবে।

ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমন্বয়ে গঠিত সাম্রাজ্যবাদী অক্ষশক্তি শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করে এবং নিজ দেশের হাজার হাজার নাগরিকের প্রাণহানি ও অঙ্গহানির বিনিময়ে ইরাক ও আফগানিস্তানে বুশ কথিত আধুনিক যুগের ক্রুসেড প্রায় এক দশক ধরে অব্যাহত রেখেছে। একবিংশ শতকের ক্রুসেডে ইরাক ও আফগানিস্তান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দেশ দুটির লাখ লাখ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে; মানব সভ্যতার আদি নিদর্শন লুটপাট করে বিজয়ীদের দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে; উভয় দেশকে চিরস্থায়ী দাসত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে। সাম্রাজ্যবাদী অভিন্ন গোষ্ঠী আজ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ইসলামিক রাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করেছে। এক নতুন ধরনের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি নিয়ে। সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় জেনারেল মইন সেনাবাহিনীকে জাতিসংঘ শান্তি মিশন থেকে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে শিখণ্ডি রূপে দণ্ডায়মান রেখে তিন বছর আগে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন।

২০০৭ সালে ক্ষমতা দখলের পর মইন-ফখরুদ্দীন জুটি তাদের বিদেশি প্রভুদের নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী শক্তিকে নির্মূল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়ার তার এই হীন প্রচেষ্টায় পেছন থেকে পাশ্চাত্যের সঙ্গে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী ভারতও জেনারেল মইনকে সেই সময় প্রয়োজনীয় সমর্থন প্রদান করেছে। এক-এগারো পরবর্তী সময়ে বহুবার লিখেছি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলাম বিদ্বেষী একটি সেক্যুলার গোষ্ঠীকে অধিষ্ঠিত করার যে পরিকল্পনা ২০০২ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে প্রণয়ন করা হয়েছিল তারই একটি পর্যায় ছিল মইন-মাসুদ গংয়ের ক্ষমতা দখল। আনোয়ার চৌধুরী, বিউটেনিস, রেনাটা, ফ্রয়েন মিলিতভাবে যে কৌশল প্রয়োগ করে বাংলাদেশে চাঁদ-তারাকে পরাজিত করে বিনা খরচায় ক্রুসেডের ঝাণ্ডাকে বিজয়ী করতে পেরেছে সেখান থেকে অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রসমূহেরও শিক্ষা নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশে ইউএনডিপি�র সাবেক প্রধান এদেশ থেকে বিদায়ের পূর্বমুহূর্তে ষড়যন্ত্রের সব দায়-দায়িত্ব অবশ্য জেনারেল মইন এবং সেই সময়কার অন্যান্য সিনিয়র জেনারেলদের ঘাড়ে চাপিয়ে গেছেন। এটাই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের চিরকালের কৌশল। এক সময়ের মার্কিন মিত্র, সেক্যুলার ভাবাদর্শের সাদ্দাম হোসেনকে সপরিবারে হত্যা করতে বর্তমান বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির নীতিনির্ধারকরা কোনো রকম বিবেকের তাড়না অনুভব করেনি। রেনাটাও বাংলাদেশের দেশদ্রোহী জেনারেলকে ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করে চীনদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এক-এগারোর বিদেশি কুশিলবদের মধ্যে এখনও যিনি সর্বশেষ ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশে রয়ে গেছেন সেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ফ্রয়েন তার যাওয়ার মুহূর্তে বাংলাদেশের বিমূঢ় জনগণকে সর্বশেষ কী তথ্য দিয়ে যান সেটি জানার জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছি।

বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের প্রচার চালিয়ে এদেশের জনগণের একটি বড় অংশের ধর্মবিশ্বাস দুর্বল করে দিয়েই সাম্রাজ্যবাদীরা রক্তপাতহীন ক্রুসেডে জয়লাভ করেছে। এখন সেই জয়কে সংহতকরণের পালা চলছে। বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের নমুনা প্রতিদিনই দেখতে পাচ্ছি। যে বিভ্রান্ত সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ তাদের উগ্র সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য পূরণে সফল হয়েছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সর্বপ্রথম সেই সেনাবাহিনীকেই চরম আঘাত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন পূর্বকালে প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের লিখিত একটি নিবন্ধের উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি মৌলবাদী প্রতিষ্ঠান রূপে চিত্রিত করেছিলেন। সেই লেখায় তিনি সেনাবাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনারও আগাম ইঙ্গিত প্রদান করেছিলেন। সজীব ওয়াজেদ জয় কোন দেশের নাগরিক তা জাতির কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। তার স্ত্রী মার্কিন নাগরিক এ তথ্য আমরা জানি। কিন্তু, তিনি খ্রিস্টান না ইহুদি ধর্মাবলম্বী তা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। কাজেই তথাকথিত বিডিআর বিদ্রোহের নামে ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার পিলখানায় নির্বিচার সেনা অফিসার হত্যাকাণ্ডকে শুধু কাকতালীয় বিবেচনার কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।

বিডিআর হত্যাকাণ্ড- পরবর্তী চৌদ্দ মাসে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি ইতিহাসের ঘৃণ্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কলঙ্কিত হয়েছে। বিরোধী দল এবং মতকে দমন করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র তার সব নির্মমতা ও ভয়াবহতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে চলছে, নারীর সম্ভ্রম ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের মাত্রা এক-এগারোর সরকারকে অতিক্রম করেছে, ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসীদের ওপর নিপীড়ন রোমান যুগে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের করুণ অবস্থা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, বিচারের বাণী আর নিভৃতে নয় প্রকাশ্যেই কেঁদে চলেছে। যে বিদেশি কূটনীতিকরা উপদেশ-নির্দেশ দিয়ে চার দলীয় জোট সরকারকে পাঁচ বছর একেবারে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল, তারাই হঠাত্ করে ভিয়েনা কনভেনশনের প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রে শুনতে পাই, দূতাবাসের বিভিন্ন গোপনীয় বৈঠকে এরা নাকি বর্তমান সরকারের ইসলামবিরোধী সার্বিক কর্মকাণ্ডে যারপরনাই সন্তুষ্টি প্রকাশ করে থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত চিহ্নিত চরম দক্ষিণপন্থী, ইসলামবিদ্বেষী দেশগুলোর কূটনীতিকরা বর্তমান সরকারকে পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী করানোর কলাকৌশল প্রণয়ন নিয়ে আগাম আলাপ-আলোচনা আরম্ভ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সংসদ, সচিবালয়, আদালত, সেনাবাহিনী, নির্বাচন কমিশন, দুদক ইত্যাদির ভূমিকা এখন সুতোয় টানা পুতুলের চেয়ে বেশি কিছু নয়। এমতাবস্থায়, রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হলে সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি প্রকৃত দেশপ্রেমিক, বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত, ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী, গণতান্ত্রিক মোর্চাকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসানোর বিকল্প নেই। প্রথম ক্রুসেডে জেরুজালেম হারানোর পর সেই পবিত্র নগরী তৃতীয় ক্রুসেডে সুলতান সালাদিনের নেতৃত্বে পুনরুদ্ধার করতে মুসলমানদের প্রায় একশ� বছর অপেক

(সুত্র, আমার দেশ, ২৫/০৪/২০১০)

এই না হলে দিনবদলের সরকার!



২০০৮ সালের ২৩ নভেম্বর ডিজিটাল নির্বাচনের আগে আমার দেশ পত্রিকায় ‘নবরূপে বাকশাল’ শিরোনামে মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলাম। সেই লেখাটির শেষ কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করলে মহাজোট সরকারের ১৫ মাস শাসনকালের চরিত্রটি জনগণের বুঝতে সুবিধা হতে পারে। লিখেছিলাম, ‘দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় মার্কিন-ভারত অক্ষশক্তির কাছে এখন বাংলাদেশের গণতন্ত্র কিংবা নাগরিকের মৌলিক অধিকার কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। প্রয়োজন হচ্ছে যে কোনো মূল্যে সর্বাবস্থায় মাথা নাড়াতে প্রস্তুত একটি পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা। কাজেই দুঃসংবাদ হচ্ছে, এবারের একদলীয় সরকারের ১৯৭৫ সালের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাই অধিক। জরুুরি আইনকে ব্যবহার করে একটি পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে এই অনৈতিক এবং দেশের স্বার্থবিরোধী প্রক্রিয়াকে আওয়ামী লীগের মতো বৈধতা দান করবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত চারদলীয় জোটের একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। তবে দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাকামী জনগণকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে এবং তা এখনই।’
বিগত ১৫ মাসে প্রমাণিত হয়েছে যে, আমার আশঙ্কা অনুযায়ী এদেশে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে প্রকৃতই একটি চরম ফ্যাসিবাদী সরকার দেশ চালাচ্ছে। এ সময়কালে নাগরিকের মৌলিক অধিকার যেভাবে হরণ করা হয়েছে তার তুলনা কেবল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এবং এক-এগারো’র সরকারের শাসনের সঙ্গে হতে পারে। গত সপ্তাহে ব্যবসায়িক কাজে লন্ডন যাওয়ার দিনেই আমার যে লেখাটি ছাপা হয়েছিল, সেখানেই সরকারের নানারকম অত্যাচারের উল্লেখ থাকায় আজ আর তার পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকছি। আমাদের পশ্চিমা মুরুব্বিরা যে নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশে প্রতিদিনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়কে উপেক্ষা করার নীতি গ্রহণ করেছে, তারও উল্লেখ গত লেখাতে রয়েছে। অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভয়ঙ্কর অবস্থার কিঞ্চিত্ চিত্র স্থান পেয়েছে। এজন্য তাদের ধন্যবাদ। ক’দিন আগেই এই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের স্থানীয় তাঁবেদাররা বিএনপিকে সংসদে ফেরানোর জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। এদের সম্মিলিত প্রচারণায় মনে হচ্ছিল বিএনপির সংসদে যোগদান না করাটাই বুঝি বাংলাদেশের উন্নয়নে একমাত্র বাধা। বিদেশিদের চাপেই হোক কিংবা সদস্যপদ রক্ষার খাতিরেই হোক, শেষ পর্যন্ত বিএনপি সংসদে ফিরেছে। সাকল্যে আড়াই ডজন সংসদ সদস্যসংখ্যার বিরোধী দল সংসদে ফেরায় দেশ ও জনগণের কী উপকার সাধিত হয়েছে, সেই মূল্যায়নে আমার কোনো গরজ নেই। তবে মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গালিগালাজ করার যে নোংরা সংস্কৃতি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে চালু করেছিলেন, তার জবাবে অপর মরহুম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানও যে এখন একইভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন, এটি প্রকৃতিরই এক ধরনের প্রতিশোধ। বিএনপির সংসদে ফেরার ফলে শেখ হাসিনার নিক্ষিপ্ত ইটের বদলে অন্তত বিএনপির পাটকেল মারার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে সেই সত্য অস্বীকারের উপায় নেই। ঠেলায় পড়ে মাননীয় স্পিকার আবদুল হামিদকেও অবশেষে বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তার প্রয়াত নেতার চরিত্রহনন ঠেকানোর জন্য নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তার চাটুকাররা যখন অসংসদীয় ভাষায় মরহুম জিয়া ও তার লাশ নিয়ে খিস্তিখেউড় করেছেন, তখন টেলিভিশনের পর্দায় স্পিকারকে বেশ স্মিতমুখেই উপভোগ করতে দেখা গেছে। শেখ মুজিবের একদলীয়, স্বৈরশাসনকে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সংসদ সদস্যরা সমালোচনা করার সাহস সঞ্চয় করাতেই এখন স্পিকারের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। জনাব আবদুল হামিদ উপায়ান্তর না পেয়ে সংসদের মর্যাদা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মূল্য উপলব্ধি করতে বাধ্য হয়েছেন এবং সংসদ সদস্যদের মুখের লাগাম টেনে ধরার জন্য মাইক বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে বিরোধী দল ও ভিন্নমতাবলম্বীদের শায়েস্তা করার নিত্যনতুন কৌশল আবিষ্কারে বাংলাদেশে অন্তত আওয়ামী লীগের জুড়ি নেই। অবস্থার চাপে অনেকটা নিরুপায় হয়েই স্পিকার যেহেতু সংসদে জিয়াউর রহমানের চরিত্রহনন প্রকল্প বাস্তবায়নে আগের মতো সহায়তা করতে পারছেন না, সেই মহান দলীয় দায়িত্ব পূরণে এগিয়ে এসেছেন ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী। তার সভাপতিত্বকালীন সরকারি দলের সদস্যবৃন্দ চুটিয়ে গাল দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন স্বাধীনতার এই মহান ঘোষককে। যুক্তি হলো, ডেপুটি স্পিকার তো আর অসংসদীয় বক্তব্য প্রদানের জন্য মাইক বন্ধের সিদ্ধান্ত নেননি। সুতরাং স্পিকার যে ভদ্রলোকের চুক্তি করেছেন সেটি মেনে চলার তার তরফ থেকে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। শেখ হাসিনা বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার মনোনীত করার প্রতিশ্রুতি থেকে কেন সরে এসেছিলেন, শওকত আলীর ভূমিকা দেখার পরও যদি বাংলাদেশের জনগণ সেটি মালুম করতে না পেরে থাকে, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় তাদেরই। মরহুম জিয়াউর রহমানের প্রতি ক্ষমতাসীনদের প্রচণ্ড আক্রোশ এবং তার অব্যাহত চরিত্রহননের উদ্দেশ্য বোঝা দরকার। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমান দুই বিপরীতমুখী ধারার রাজনীতির অবিসংবাদিত প্রতীক। জিয়াউর রহমানকে ঘিরেই এ দেশে স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং উপনিবেশবাদবিরোধী, আত্মমর্যাদাশীল জনগোষ্ঠীর রাজনীতি আবর্তিত হয়। এই রাজনীতির চর্চা যতদিন এদেশে অব্যাহত থাকবে ততদিন আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের বাংলাদেশকে আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত করার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন যে কোনোভাবেই সম্ভব হবে না, এই সত্যটি আওয়ামী লীগ এবং তাদের বিদেশি মিত্রশক্তি জানে বলেই জিয়াউর রহমানের সত্, দেশপ্রেমিক এবং বীরত্বপূর্ণ ভাবমূর্তি তাদের সকল আক্রমণের নিশানা। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করে বিএনপি নামক যে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তারা এই মহান ব্যক্তিত্বের দেশপ্রেম, বীরত্ব, সততা এবং রাজনৈতিক দর্শনকে নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ তো করেইনি, উপরন্তু জনগণের মধ্যে প্রচার করা থেকেও বিস্ময়করভাবে বিরত থেকেছে। বিএনপির সংসদে ফেরার সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাত্র কিছুদিন আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকজন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমার মধ্যাহ্নের আহার গ্রহণের বিরল সুযোগ হয়েছিল। সেখানে শুনছিলাম এক-এগারোর সমর্থনকারী রাষ্ট্রদূতরা কেমন সমস্বরে একপেশেভাবে সংসদ বর্জনের জন্য বিএনপির নীতিনির্ধারকদের দোষারোপ করছিলেন। সেই মধ্যাহ্নভোজে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। আশা করি, সংসদে আওয়ামী লীগের অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভূমিকার পর রাষ্ট্রদূতদের সেদিনের সমালোচনার যথোপযুক্ত জবাব এতদিনে বিএনপির নেতারা দিতে পেরেছেন। অবশ্য এটাও সত্য যে, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের দ্বিমুখী নীতির জন্য সারাবিশ্বেই বিশেষভাবে পরিচিত এবং নিন্দিত। বাংলাদেশ সেক্যুলার রাজনীতির কট্টর সমর্থক এই একচোখা কূটনীতিকরা যে যুক্তি বুঝতে চাইবেন না, সেটাই স্বাভাবিক।
মইনউদ্দিনের জেলখানায় বন্দি অবস্থায় শেখ হাসিনার খাদ্যে ‘স্লো পয়জনিং’ তত্ত্ব এতদিন আমরা তার ব্যক্তিগত চিকিত্সক ডা. মোদাচ্ছের আলী এবং সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর কাছ থেকে শুনেছি। গত বৃহস্পতিবার সংসদে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাকে স্লো পয়জনিং করে হত্যার প্রচেষ্টার অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। এই দাবির পর বিষয়টিকে কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে দেখার আর সুযোগ নেই। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা হামলার মামলায় বহুসংখ্যক ব্যক্তিকে তদন্তের নামে দীর্ঘদিন ধরে বিনাবিচারে আটক রাখা হয়েছে, বারবার রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, বিভিন্ন সুশীল(?) মিডিয়ায় প্রচারণা চালিয়ে কোনোরকম সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই এই মামলায় বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দকে জড়ানোর অপচেষ্টা চলছে এবং সর্বশেষ একটি মুখোশধারী দলবাজ সংগঠনের অনুষ্ঠানে প্রধান অভিযুক্ত আসামি মুফতি হান্নানের কথিত জবানবন্দির সিডি তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের সহায়তায় প্রদর্শিত হয়েছে, যার মাধ্যমে তারেক রহমানকেও বোমা হামলার ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী, ২১ আগস্ট বোমা হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন শেখ হাসিনা, যদিও মহান আল্লাহতায়ালার মেহেরবানিতে কানের কিছু সমস্যা তৈরি হওয়া ছাড়া তিনি অক্ষত থাকতে পেরেছেন। আইন কী বলবে জানি না, তবে খাদ্যে বিষপ্রয়োগ এবং বোমা হামলা উভয়ই আমার দৃষ্টিতে হত্যাপ্রচেষ্টা। একটি হত্যাপ্রচেষ্টার রহস্য উদ্ঘাটনে সরকার অতিমাত্রায় সচেষ্ট হলেও অপর হত্যাপ্রচেষ্টার ব্যাপারে এতটা চুপচাপ কেন, সংসদে শেখ হাসিনার দাবির পর এই প্রশ্ন জনমনে উত্থাপিত হতে বাধ্য। তত্কালীন সরকারপ্রধান ড. ফখরুদ্দীন, সেনাপ্রধান জেনারেল মইন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেনারেল এমএ মতিনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই হত্যাপ্রচেষ্টার অভিযোগের দায় এড়াতে পারেন না। কাজেই সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের বিশ্বস্ততা প্রমাণের জন্য অনতিবিলম্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিষপ্রয়োগে হত্যাপ্রচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের হওয়া উচিত। আর ক্ষমতাসীনরা তাদের ডিজিটাল নির্বাচনী আঁতাতের বাধ্যবাধকতায় যদি তাদের জরুরি মিত্রদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিরোধী দলের কাছ থেকে জনগণ প্রত্যাশা করবে যে অন্তত তারা ঘোষণা করবে ভবিষ্যতে কখনও বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ লাভ করলে একজন জাতীয় নেতাকে হত্যার হীন প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই বিচার করা হবে।
নিজমুখে স্লো পয়জনিংয়ের মতো গুরুতর অভিযোগ আনার দিনেই সংসদে শেখ হাসিনা আরও দাবি করেছেন, বিএনপি তাদের শাসনামলে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বাজারে ছেড়ে দিয়ে নাকি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এই অভিযোগের জবাব দেয়ার দায়িত্ব প্রধান বিরোধী দলের নীতিনির্ধারকদের। তবে অর্থনীতিবিদ না হলেও প্রায় তিন দশক ধরে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে শেখ হাসিনার এই নতুন তত্ত্ব প্রসঙ্গে আমার মনে কয়েকটি প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি যে বৃদ্ধি পাবে এটা অত্যন্ত খাঁটি কথা। প্রশ্ন হলো, বিএনপি কোন পদ্ধতিতে টাকা ছাড়ছে? তারা কি রাতের আঁধারে লোকের হাতে হাতে নগদ টাকা বিলি করছে? নাকি দুর্নীতিলব্ধ টাকা দিয়ে সব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বাজার থেকে কিনে নিয়ে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে মূল্যবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে? যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করেই থাকে, তাহলে সেই বিপুল পরিমাণ পণ্য কোথায় গুদামজাত করছে? এত গুদাম বাংলাদেশে কোথায়? শেষ প্রশ্ন হলো, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বিএনপির এই অপতত্পরতা উদ্ঘাটন অথবা আটকাতে পারছে না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়া ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর এ-জাতীয় বায়বীয় অভিযোগ উত্থাপন সরকারের ব্যর্থতা ঢাকার দুর্বল প্রচেষ্টা ও দেশের দারিদ্র্যক্লিষ্ট জনগণের সঙ্গে তামাশা হিসেবেই বিবেচিত হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ১৯৭২ সাল থেকেই এদেশের জনগণের দারিদ্র্য এবং সরলতাকে পুঁজি করে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অব্যাহতভাবে প্রতারণা করেই চলেছে।
এবার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসা যাক। পেট্রোবাংলা কর্তৃক শেভরনকে বিনা টেন্ডারে ৩৭০ কোটি টাকার কাজ প্রদানসংক্রান্ত দুর্নীতির খবর আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার অপরাধে বিগত তিন মাস ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং ক্ষমতাসীন দলের সবধরনের নির্মম নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছি। এ প্রসঙ্গে ‘সততায় পারবেন না, প্রধানমন্ত্রী’ এবং ‘দুদক নামের পুতুল’ শিরোনামে দুটি মন্তব্য প্রতিবেদনও লিখেছি। দেরিতে হলেও উচ্চআদালতের সংবিধান প্রদত্ত মানবাধিকার রক্ষায় যথাযথ ভূমিকার কারণে আমার বিদেশযাত্রা আটকাতে না পেরে, সরকার তার সর্বশেষ অস্ত্রটি নিক্ষেপ করেছে। এ মাসের ৮ তারিখে আদালতের রায় নিয়ে লন্ডনযাত্রার একদিন পর ১০ তারিখে সরকারের আজ্ঞাবহ দুদক পত্রবাহক মারফত একটি অভিযোগপত্র আমার বাসায় প্রেরণ করে। সর্বৈব মিথ্যা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এখতিয়ারবহির্ভূত বিচিত্রসব অভিযোগ সংবলিত সেই পত্রে আমাকে ১৬ তারিখে দুদক কার্যালয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। পত্রের অভিযোগগুলো সবই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ১৭ জানুয়ারি তারিখের তদন্ত-প্রতিবেদনে যে কল্পকাহিনী বয়ান করা হয়েছে, তারই পুনরুল্লেখমাত্র। প্রতিটি অভিযোগের জবাব এই আমার দেশ-এর পাতাতে আমি আগেই দিয়েছি। সরকার হয়তো ধারণা করে নিয়েছিল, বিদেশে অবস্থানরত সময়ে দুদকের আনুষ্ঠানিক নোটিশ পেলে আমি আর দেশে না ফিরে এই সরকারের বাকি সময়টা প্রবাসী জীবনযাপন করার সিদ্ধান্ত নেব। বর্তমান সরকারপ্রধানসহ অন্যান্য কর্তাব্যক্তি জরুুরি সরকারের আমলে যেভাবে বিদেশে পালিয়ে ছিলেন, সম্ভবত আমাকেও তারা একই ধাতুর তৈরি ভেবে নিয়েছেন। তাদের বোঝা উচিত ছিল দুর্নীতি না করলে বুকের পাটা একটু চওড়াই হয়ে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে গেল, যে কোম্পানিতে চাকরি করার বিনিময়ে প্রাপ্ত বেতনাদি নিয়ে দুদক আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা সাজাতে গলদঘর্ম হচ্ছে, সেই একই প্রতিষ্ঠান থেকেই বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং সরকারের অন্যান্য কর্তাব্যক্তির অর্থকড়িসহ নানারকম সুবিধা চাকরিরত অবস্থায় স্বচক্ষে নিতে দেখেছি। সময়-সুযোগমত সেসব কাহিনী জনগণকে জানানো যাবে। এক-এগারোর সময় এসব কাহিনী তথ্যপ্রমাণসহ বিশেষ স্থানে জানিয়ে সামরিক জান্তার বিশ্বাসভাজন হওয়া অত্যন্ত সহজ ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের মতো এতটা নিচে নামতে রুচিতে বেধেছিল। যা-ই হোক, দুদকের চিঠি দেয়ার সংবাদ পাওয়ার পর আমি না পালিয়ে বরং প্রত্যাবর্তনের নির্ধারিত দিনের একদিন আগেই অর্থাত্ ১৪ মার্চ দেশে ফিরেছি এবং দুদকের নোটিশের যথাযথ জবাবও ইতোমধ্যে প্রেরণ করেছি। সরকারের আজ্ঞাবহ দুদকের কর্তাব্যক্তিদের জন্য আমি একপ্রকার করুণাই বোধ করি। এদের অবস্থা এতটাই নতজানু যে, তথাকথিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ভড়ং দেখানোর সাহসও আর অবশিষ্ট নেই। শেখ হাসিনার একসময়ের সচিব যেদিন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, সেদিনই প্রকৃতপক্ষে দুদকের কফিনে শেষ পেরেকটি মারা হয়ে গেছে। বিভিন্ন উত্স থেকে শুনতে পাই যে, বিশেষ সংস্থায় কর্মরত বিদেশি তাঁবেদার গোষ্ঠীই নাকি সেই এক-এগারোর সময়কালীন অবস্থার মতোই পেছন থেকে দুদক চালিয়ে থাকে। একসময়ের দেশপ্রেমিকদের আত্মা কত সহজেই না শয়তানের কাছে বিক্রি হয়ে গেল! বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি এখন বিদেশি শক্তির স্বার্থে বিদেশি শক্তির দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে। এই বৈরী পরিস্থিতিতে যারাই জনগণ ও রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করবে, তাদেরই অবধারিত নির্যাতনের শিকার হতে হবে। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমি এক-এগারোর পর আমার কর্তব্য স্থির করেছিলাম। আল্লাহ যতদিন হায়াত দিয়েছেন, ততদিন সাম্রাজ্যবাদী এবং আধিপত্যবাদী শক্তির বিরোধিতা করে যাব সর্বশক্তি দিয়ে। বাংলাদেশকে নিয়ে কাছের ও দূরের পরাশক্তির সব যড়যন্ত্র মোকাবিলা করে তাদের প্রতিরোধের জন্য জনগণের কাছে ডাক দিয়ে যাব। সাধ্যমত চেষ্টা করব তাদের সচেতন করে তুলতে। ২০০৮-এর নভেম্বরের যে লেখাটির শেষ অনুচ্ছেদ উদ্ধত করে আজ খলম হাতে নিয়েছিলাম, সেখানেও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরোধ যুদ্ধেরই আহ্বান ছিল। সেই যুদ্ধ এখনও শুরু করা যায়নি। জনগণ হয়তো এখনও পুরোপুরি জাগেনি, তারপরও আমি হতাশ নই। পলাশীর যুদ্ধে স্বাধীনতা হারানোর পর প্রায় দু্ইশ' বছর লেগেছিল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শক্তিকে এদেশ থেকে বিতাড়িত করতে। স্বাধীনতা পুরুদ্ধারের সেই সংগ্রামে কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, কত সন্তান পিতা-মাতাহারা হয়েছে, কত নারী তার প্রিয়জন হারিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা আটকানো যায়নি। বাংলাদেশের বন্দর এবং অন্যান্য সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য যারা লোলুপ হাত বাড়িয়েছে, তাদের চূড়ান্ত লড়াইয়ে পরাজিত করতে আল্লাহর রহমতে আশা করি, অতটা দীর্ঘ সময় লাগবে না।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ১৮/০৩/১০]

স্বাধীন বিচারের নামে তামাশা

স্বাধীন বিচারের নামে তামাশা

মাহমুদুর রহমান

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে এই রাজধানীতে প্রায় প্রতিদিন অন্তত একটি করে সেমিনারের আয়োজন করা হতো। তত্কালীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে উদগ্রীব স্বার্থান্বেষী বিদেশি মহলের অর্থায়নে এ দেশের চিহ্নিত পরজীবী শ্রেণী সেসব সেমিনার আয়োজনের দায়িত্বে থাকত। সুশাসন নামটি ফেরি করার সুবিধার্থে নতুন নতুন সংগঠনও গজিয়ে উঠেছিল সুশীল(?) সমাজের চাঁইদের সমন্বয়ে। জেনারেল মইন ও তার শাসন ব্যবস্থার অনুসারী শেখ হাসিনার যৌথ শাসনের সাড়ে ৩ বছরে দেশে প্রকৃতপক্ষে জঙ্গলের আইন চললেও আইনের শাসনের দেশি-বিদেশি ধ্বজাধারীদের টিকিটিরও আর নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত তাদের বিবেচনায় শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশে আইনের শাসন ও সুশাসন উভয়ই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের জনগণ সংবিধানে প্রদত্ত সব অধিকার বিনা বাধায় ভোগ করতে পারছে। সুশীলদের(?) এ জাতীয় পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিবেচনাবোধ আমাদের মতো আমজনতার বুদ্ধির অগম্য হওয়ারই কথা। ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আমরা বুঝি, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্তই হচ্ছে রাজনৈতিক পক্ষপাতশূন্য, বিবেক দ্বারা তাড়িত বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিচার ব্যবস্থা। ২০০৭ সালের জানুয়ারির ১১ তারিখে জেনারেল মইনের ক্ষমতা দখলের পর থেকে এ দেশের বিচার বিভাগে যে পচনক্রিয়া শুরু হয়েছে শেখ হাসিনার আমলে তা দ্রুততর হয়ে এখন সেখান থেকে রীতিমত দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। এই মন্তব্যের মাধ্যমে আমি এ ধরনের কোনো অসার দাবি করতে চাচ্ছি না যে, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশের আদালতপাড়ায় কোনোই রাজনীতিচর্চা হতো না, কিংবা জায়গাটি একেবারে সুবিচারের পীঠস্থানে পরিণত হয়েছিল। তবে এটুকু বোধহয় সবাই মানবেন যে, মূল্যবোধের অবক্ষয় চলমান থাকলেও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তখন পর্যন্ত অন্তত খানিকটা চক্ষুলজ্জা অবশিষ্ট ছিল। কিংবা তারও আগে শেখ হাসিনার প্রথমবারের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় উচ্চ আদালতের মেরুদণ্ড এতটাই শক্ত ছিল যে, তারা তত্কালীন দুর্বিনীত প্রধানমন্ত্রীকে Wrong Headed (বিকৃত বুদ্ধি) অভিহিত করতেও কোনো ধরনের দ্বিধা করেননি। ভাবতে অবাক লাগে, বর্তমানের বিচারপতিরা উচ্চ আদালতের একই আসনে বসলেও পূর্বসূরিদের কাছ থেকে বিচারকের সাহস, নিরপেক্ষতা, সংবিধানের প্রতি আনুগত্যবোধ কিছুই শিখতে পারেননি। সমাজের নানা স্তরের অবক্ষয় মেনে নেয়া গেলেও বিচার বিভাগের অবক্ষয় বিনা প্রতিবাদে মুখ বুঝে সহ্য করা হলে এই রাষ্ট্রের বিনাশ অনিবার্য।

এক-এগারোর পর থেকে অব্যাহতভাবে বাংলাদেশে নজিরবিহীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বেশুমার ঘটনা ঘটে চলেছে। জেনারেল মইন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিচার বিভাগের নানা দুর্বলতাসৃষ্ট অসহায় আত্মসমর্পণের সুযোগ নিয়েই এই নিপীড়ন চালাতে পেরেছেন বা পারছেন। জরুরি সরকারের সময় গুটিকয়েক সাহসী ও বিবেকসম্পন্ন বিচারককে ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করলে তত্কালীন বিচার বিভাগ একটি অবৈধ ও জুলুমবাজ সরকারের সহায়তাকারীর ভূমিকায় নিঃসন্দেহে অবতীর্ণ হয়েছিল। নির্বাচিত সরকারের আমলে অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫-এ বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে নিম্নবর্ণিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে :
�অনুচ্ছেদ-৩৫ : বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ।�

১) অপরাধের দায়যুক্ত কার্যসংঘটনকালে বলবত্ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবে না এবং অপরাধ-সংঘটনকালে বলবত্ সেই আইন বলে যে দণ্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাহাকে তাহার অধিক বা তাহা হইতে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাইবে না।
২) এক অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারিতে সোপর্দ ও দণ্ডিত করা যাইবে না।
৩) ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারলাভের অধিকারী হইবেন।
৪) কোন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাইবে না।
৫) কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।
৬) প্রচলিত আইনে নির্দিষ্ট কোন দণ্ড বা বিচারপদ্ধতি সম্পর্কিত কোন বিধানের প্রয়োগকে এই অনুচ্ছেদের(৩) বা (৫) দফার কোন কিছুই প্রভাবিত করিবে না। �

বিগত সাড়ে ৩ বছরে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত উপরোক্ত ধারাটির প্রত্যেকটি নির্দেশনা জরুরি ও নির্বাচিত উভয় সরকারই নির্দ্বিধায় অমান্য করেছে। হাইকোর্টের একজন মাননীয় বিচারপতি বর্ণিত সোনার শিকলে বাঁধা স্বাধীন বিচার বিভাগ জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করার কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ তো দূরের কথা, নিজেরাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারকে নির্যাতনের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। বছরের পর বছর কোনো ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কেবল সরকারের বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে দুগ্ধপোষ্য শিশু, বালক, মহিলা নির্বিশেষে অসংখ্য ব্যক্তিকে বিনাবিচারে আটক রাখা হলেও উচ্চ আদালত চোখে কালো পট্টি বেঁধে যার যার আসন রক্ষা করতে ব্যস্ত। অত্যাচারিতদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করলেও চেম্বার নামক ফাটকে আবার বিশাল তালা মেরে দেয়া হচ্ছে। হাইকোর্টের বিচারিক অধিকার কেড়ে নেয়ার যে প্রক্রিয়া মইনের চেম্বার জজরা আরম্ভ করেছিলেন তা শুধু অব্যাহতই নেই, বর্তমানে হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিদের প্রদত্ত রায় নিয়ে অবমাননাকর ছেলেখেলা করা হচ্ছে। এই সংক্রান্ত একটি সংবাদ �চেম্বার মানেই সরকার পক্ষের স্টে� শিরোনামে �আমার দেশ� পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার অপরাধে আমার বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আদালত অবমাননার মামলা করা হয়েছে। দেশের উচ্চতম আদালতে বিচারাধীন বিষয় সম্পর্কে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কোনো নাগরিক মন্তব্য করার অধিকার রাখেন না। আমারও সেই সুযোগ নেই। শুধু এটুকু আগাম বলে রাখছি, সত্য কথা প্রকাশের অপরাধে কারাগারে যেতে আমি বরং গৌরবই বোধ করব। কারাগার থেকে জীবিত ফিরে আসতে পারলে আবার সত্য কথা বলব এবং লিখব, প্রয়োজনে পুনর্বার কারাগারে যাব।

আপিল বিভাগের মাননীয় বিচারপতিদের আইনের নজির দেখানোর ধৃষ্টতা আমি রাখি না। তবে পাঠকের জ্ঞাতার্থে নাসরীন কাদের সিদ্দিকী বনাম রাষ্ট্রের একটি মামলায় আপিল বিভাগ প্রদত্ত রায়ের অংশবিশেষ এখানে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় উদ্ধৃত করতে চাচ্ছি,
��A question of fact or mixed question of fact and law ought to be raised in the High Court Division for a proceeding under Article 102 of the Constitution. An appellant should not ordinarily be allowed to convert the Appellate Division into a court of first instance.
[Nasrin Kader Siddiqui vs Bangladesh 44 DLR(AD)16]�
(তথ্যসংক্রান্ত প্রশ্ন অথবা তথ্য ও আইনের বিশ্লেষণ মিশ্রিত প্রশ্ন সংবিধানের ১০২ ধারা অনুযায়ী হাইকোর্ট ডিভিশনে উত্থাপিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। আপিল বিভাগকে প্রাথমিক বিচারিক আদালতে পরিণত করার সুযোগ গ্রহণ করা থেকে মামলার আপিলকারীকে সাধারণভাবে নিবৃত্ত করতে হবে।)

উপরোক্ত রায়ের আলোকে এক-এগারো পরবর্তী চেম্বার জজদের রায়ের বিশ্লেষণ করা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই অত্যন্ত জরুরি। হাইকোর্ট ডিভিশন থেকে সরকারের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের রুল ও স্থগিতাদেশ জারি হওয়া মাত্র চেম্বারে সেই রায় স্থগিত করার প্রবণতা বিগত সাড়ে ৩ বছরে বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী হাইকোর্ট ডিভিশনে তথ্যের সত্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা এবং আইনি প্রশ্ন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের সুযোগ সঙ্কুচিত করে ইনসাফের রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। কোনো মামলায় হাইকোর্ট ডিভিশন রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেয়ার পর আপিলের অবশ্যই যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু সরকারকে হাইকোর্ট বিভাগের রুলের জবাব দেয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে বাঁচানোর অপচেষ্টাকে আর যাই হোক আইনের শাসন বলা যেতে পারে না। এতে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও বিশ্বস্ততা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের যৌথ, সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল। সেই স্বাধীনতার খোলসের আড়ালে বিচার বিভাগের এমন বন্দিদশা এদেশে আমরা আগে কখনও দেখিনি। মরহুম শেখ মুজিবের ফ্যাসিবাদী শাসনামলেও রক্ষীবাহিনীর কার্যক্রমকে বেআইনি ঘোষণা করে রায় দেয়ার মতো বিবেকসম্পন্ন ও সাহসী বিচারকরা উচ্চ আদালতে ছিলেন। এদেশের নাগরিকের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সেই সময় হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ পরস্পরকে সহযোগিতা করতেন। এক-এগারো দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার পাশাপাশি উচ্চ আদালতের দুই বিভাগকেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের ভূমিকায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এবং এর সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে আদালতপাড়ায় নজিরবিহীন দলীয়করণ। সামগ্রিক অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছে যে, উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারকবৃন্দ তাদের নিয়োগপ্রাপ্তির সংবর্ধনার আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় সংবিধান ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করার পরিবর্তে দলীয় নেতানেত্রীদের বন্দনাতেই অধিকতর সময় ব্যয় করেন।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে মাননীয় বিচারকদের সঙ্কীর্ণ দলীয় চিন্তাধারা অতিক্রম করে কেবল সংবিধান ও দেশের আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়া অত্যাবশ্যকীয়। আমাদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিচার বিভাগকে দলীয়করণের যে মন্দ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে সেখান থেকে তারা নিবৃত্ত না হলে জাতি হিসেবে আমরা ক্রমেই অনিবার্য ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাব। আমাদের দেশের দুর্গতির জন্য এক সময় ব্যবসায়ীদের দায়ী করা হতো। তারপর আমলা এবং রাজনীতিকদের। একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শেষ ভরসার স্থল বিচার বিভাগ এবার কলঙ্কিত হয়েছে। বিচারপতি নিয়োগ থেকে শুরু করে বিচারকদের আচার-আচরণ, সর্বত্র অবক্ষয়ের সুস্পষ্ট চিহ্ন দৃশ্যমান। এই অনাচারের পরিণামে জাতি হিসেবে সম্মিলিতভাবে শেষ পর্যন্ত হয়তো চরম মূল্যই আমাদের দিতে হবে। বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানে অন্যায়-অবিচারের ভয়াবহ বিস্তৃতি এক সময় দোষী নির্দোষ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সব নাগরিককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে যখন ক্যালদীয়রা পবিত্র নগরী জেরুজালেম আক্রমণ করতে ধেয়ে আসছিল, সেই সময়ের নবী যেরেমিয়া আক্ষেপ করে বলেছিলেন, জাতির সঞ্চিত পাপ সমস্ত জাতিকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় (অভিশপ্ত নগরী, সত্যেন সেন)।

গত শনিবার সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের এক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বক্তৃতাকালে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, এক-এগারোর ভূত এখনও সুপ্রিমকোর্টে ঘোরাফেরা করছে। ভূত তাড়ানোর জন্য তিনি সেখানে মিলাদ পড়ানোরও প্রস্তাব করেছেন। একই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া অবশ্য সেই এক-এগারোর ভূতকে তাড়ানোর জন্য গণ-আন্দোলনের কথা বলেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, মাননীয় বিচারপতিরা ভূতের হাত থেকে আদৌ নিষ্কৃতি পেতে চান কিনা। আগেই বলেছি, কয়েকজন ব্যতিক্রম ছাড়া অন্যদের মধ্যে বিবেকের অস্তিত্ব দুঃখজনকভাবে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রায় প্রদানকালে আইনের ব্যাখ্যার পরিবর্তে বাদীর রাজনৈতিক পরিচয় এখন অধিকতর গুরুত্ব পাচ্ছে। যে বিচারপতি বিশেষ কোনো দলের দণ্ডপ্রাপ্ত নেতাকে আইনবহির্ভূতভাবে বিরল ছাড় দিয়ে হাইকোর্ট থেকে সরাসরি জামিন দিচ্ছেন, তিনিই আবার অন্যদের ক্ষেত্রে ন্যায্য জামিন স্থগিত করছেন। এক বিচারপতি তো বিদেশি নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করে উচ্চ আদালতে বিচারকের চাকরি নিয়ে দিব্যি দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। হারানো বিবেক ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ এদের মধ্যে জনগণ দেখতে পাচ্ছে না। নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তারা বরং আদালত অবমাননা নামক এক দেয়াল খাড়া করে আত্মরক্ষার ব্যর্থ চেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছেন। বিচার বিভাগের করুণ অবস্থা প্রত্যক্ষ করেই সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের বিচার বিভাগকে কাচের ঘরের সঙ্গে তুলনা করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি এই ভঙ্গুর ঘরটির যে কোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন। যে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এক-এগারো পরবর্তী সময়ে সাহসিকতার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনিও নির্বাচিত সরকারের আমলের বিচার বিভাগের ভূমিকায় একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রদত্ত সাক্ষাত্কারে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

অত্যাচারী শাসক ও ক্ষমতাবানদের নির্যাতন, নিপীড়ন, জুলুম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই একজন মজলুম নাগরিক আদালতের শরণাপন্ন হয়। পৃথিবীতে বিচারকদের ওপরই ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মহান দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্তায়ালা পবিত্র কোরআন শরিফের সুরা আল-হাদীদের ২৫নং আয়াতে বলেছেন, �আমি আমার রসুলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।� আজকের বাংলাদেশের আদালতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনরা প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। দুর্ভাগ্যক্রমে বিচারকদের মধ্যকার একটি বৃহত্ গোষ্ঠী ক্ষমতাসীনদের এসব অপতত্পরতার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিরোধ সৃষ্টি না করে বরং ন্যক্কারজনকভাবে তাদের সক্রিয় সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এসব বিচারকের মধ্যে কেউ কেউ আবার বাহ্যিকভাবে নাকি ধর্মপালনও করে থাকেন। ধর্মপালনকারীদের মধ্যকার ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা শুনেছি নিয়মিত নামাজও আদায় করেন। তাদের উদ্দেশ্যে সুরা আল-বাকারা�র তিনটি আয়াত উদ্ধৃত করে আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন সমাপ্ত করব।

সুরা আল-বাকারা
(৮) আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ঈমানদার নয়।
(৯) তারা আল্লাহ্ ও ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এতে তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না।
(১০) তাদের অন্তকরণ ব্যাধিগ্রস্ত এবং আল্লাহ্ তাদের ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তুত তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আজাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন।
পুনশ্চ : লেখার শুরুতেই বলেছিলাম আমার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে আদালত অবমাননার একটি মামলা দায়ের হয়েছে। আজই সম্ভবত আপিল বিভাগে সেই মামলার প্রথম শুনানি। পাঠক যখন আমার এই লেখা পড়ছেন তখন হয়তো আপিল বিভাগে আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার শুনানি চলছে। আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন লেখার অপরাধে আদালত অবমাননার দ্বিতীয় মামলা মোকাবিলারও আগাম মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম। মহান আল্লাহ্ আমাদের সুপথে পরিচালিত করুন।
(সুত্র, আমার দেশ, ১০/০৫/২০১০)