মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১২

মন্তব্য প্রতিবেদন : লুটেরা শাসক নির্জীব জনগণ



মাহমুদুর রহমান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছুদিন আগে প্রদত্ত এক বক্তৃতায় দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই নাকি বাংলাদেশের জনগণ কিছু পায়। শেখ পরিবার দেশ ও জনগণকে কেবল দিতেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও দয়া করে ক্ষমতায় আসেন। প্রধানমন্ত্রীর পিতার আমলে জনগণের প্রাপ্তিস্বরূপ দুর্ভিক্ষ, গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, বাকস্বাধীনতা হরণ, একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি নিয়ে গত তিন যুগে প্রচুর কথাবার্তা, লেখালেখি হওয়ায় আজ আর তার পুনরুল্লেখ করছি না।
শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে দিন বদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারত-মার্কিন প্রশাসন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ক্ষমতায় বসেছিলেন। আর মাত্র একদিন বাদেই সেই ডিজিটাল সরকারের তিন বছর পূর্ণ হতে চলেছে। একটি গণতান্ত্রিক সরকার সাধারণত প্রথম চার বছরের মধ্যেই নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির সিংহভাগ যথাসম্ভব পালন করার চেষ্টা করে। মেয়াদের শেষ বছরটি রাজনৈতিক ডামাডোল এবং পরবর্তী নির্বাচনের প্রচারণাতেই মূলত পার হয়ে যায়। সেই হিসেবে দিন বদলের সনদ বাস্তবায়ন করতে এই সরকারের হাতে আর মাত্র বারোটি মাস সময় রয়েছে। গত তিন বছরের পারঙ্গমতা বিবেচনা করলে পরবর্তী বারো মাসে বাংলাদেশের জনগণের দুর্ভোগ বৃদ্ধি ছাড়া সোনিয়া-মনমোহনের পোষ্য সরকার আর কিছুই যে দিতে পারবে না, এটা বোধহয় দেশের সচেতন নাগরিকমাত্রই বুঝতে পারছেন। অবশ্য যারা জেগে ঘুমাচ্ছে, তাদের কথা আলাদা। যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনে করছেন, তিনি জনগণকে নাকি এর মধ্যেই অনেক কিছু দিয়ে ফেলেছেন। আজকের মন্তব্য-প্রতিবেদনে আমি কেবল জ্বালানি খাতে জনগণের প্রাপ্তি নিয়েই আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই।
চার দলীয় জোট সরকারের একেবারে শেষদিকে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াআমাকে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত জ্বালানি উপদেষ্টারও দায়িত্ব দিয়ে মাত্র ১৫ মাসের জন্য ওই মন্ত্রণালয়টি দেখভালের সুযোগ দিয়েছিলেন। অনেক পাঠকের মধ্যে এই ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, এক এগারোতে দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘদিন কারাভোগকারী বর্তমান মহাশক্তিধর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর মতো আমিও বিদ্যুত্ ও জ্বালানি উভয় মন্ত্রণালয়েরই দায়িত্বে ছিলাম। একাধিকবার পাঠকদের এই ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করেছি। তারপরও অনেকেই দেখেছি জেনেও না জানার ভান করছেন। আজ পুনরায় বলছি যে, আমি কেবল বিপিসি এবং পেট্রোবাংলা অর্থাত্ জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লা সংক্রান্ত বিভাগগুলোই চালিয়েছি। জোট সরকারের পাঁচ বছরে দুই দফায় বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং মেজর জেনারেল (অব.) আনোয়ারুল কবির তালুকদার।
জনগণের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বর্তমান সরকার সদ্য বিদায় নেয়া বছরে পাঁচ দফায় সব প্রকার জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। জয়তু শেখ হাসিনা। ভবিষ্যতের কোনো সরকারের পক্ষে এই রেকর্ড অতিক্রম করা আসলেই কঠিন হবে। অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন, ফার্নেস অয়েল এবং সিএনজি—এই ছয়টি জ্বালানি পণ্যের চার দলীয় জোট সরকার এবং বর্তমান আমলের মূল্যের একটি তুলনামূলক তালিকা পাঠকের পরিস্থিতি বোঝার সুবিধার্থে উদ্ধৃত করে বর্তমান সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

অক্টোবর ২০০৬ জানুয়ারি ২০১২ মূল্যবৃদ্ধি
(টাকা) (টাকা) (টাকা) (%)
ফার্নেস অয়েল ২০/লিটার ৬০/লিটার ৪০ ২০০
ডিজেল ৩৩/লিটার ৬১/লিটার ২৮ ৮৫
কেরোসিন ৩৩/লিটার ৬১/লিটার ২৮ ৮৫
পেট্রোল ৫৬/লিটার ৯১/লিটার ৩৫ ৬৩
অকটেন ৫৮/লিটার ৯৪/লিটার ৩৬ ৬২
সিএনজি ৮.৫০/ঘন মিটার ৩০/ঘন মিটার ২১.৫০ ২৫৩

শেখ হাসিনা, মাল মুহিত, তৌফিক-ই-ইলাহী এবং আওয়ামী লীগের চেলা-চামুণ্ডারা বিভিন্ন গণমাধ্যমে অম্লান বদনে যুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভর্তুকি বেড়ে যাওয়াতেই নাকি এমন অকল্পনীয় হারে সরকারকে বাধ্য হয়ে বার বার দাম বাড়াতে হচ্ছে। চরিত্রগতভাবে মিথ্যাচারে অভ্যস্ত আওয়ামী নেতৃবৃন্দের এই দাবি যে কত অসার, তার জন্য একটি প্রমাণ দেয়াই সম্ভবত যথেষ্ট হবে। ২০০৬ সালের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক বাজারে যে পরিশোধিত ডিজেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি মার্কিন ডলার ৮৪ ছিল, তার বর্তমান মূল্য মার্কিন ডলার ১২০। অর্থাত্ এক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ ৪৩ শতাংশ। এই ৪৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে জননেত্রীর দাবিদার শেখ হাসিনা জ্বালানি খাতে জনগণের কাঁধে পণ্য ভেদে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়েছেন সর্বনিম্ন ৬৩ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২৫৩ শতাংশ পর্যন্ত। প্রধানত, গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের ব্যবহার্য এক কেরোসিনের দামই বেড়েছে শতকরা ৮৫ ভাগ! পরিবহন ও সেচ কার্যের জন্য ব্যবহৃত ডিজেলের মূল্যও বেড়েছে ৮৫ শতাংশ হারে।
জ্বালানি উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালীন জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে জ্বালানির মূল্য সীমিত রাখার লক্ষ্যে কৌশল প্রণয়নে অনেক বিনিদ্র রজনী যাপন করেছি। অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে ভারতে চোরাচালান এবং মজুতদারি করে কৃত্রিমভাবে মূল্য বাড়াতে না পারে, তার জন্য দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে বিপিসি চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ সহকর্মীকে নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছি। শত শত কিলোমিটার গাড়ি চালাতে যে তেল কিনতে হয়েছে, তার দামও নিজের গাঁটের পয়সা থেকেই দিয়েছি, সরকারের খরচ বাড়াইনি। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে নিয়মিত শলা-পরামর্শ করে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানকে ম্যানেজ করতে হয়েছে। অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের ওপর বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ দাম বাড়ানোর জন্য অবিরত চাপ সৃষ্টি করে গেলেও সাধারণ মানুষের কল্যাণে অন্তত ডিজেল, কেরোসিন, ফার্নেস অয়েল এবং এলপিজি’র মূল্য যথাসম্ভব সীমিত যে রাখতে পেরেছিলাম, তার অকাট্য প্রমাণ ২০০৬ এবং ২০১২ সালের জ্বালানির মূল্যের উপরে প্রণীত তুলনামূলক চার্টেই মিলবে। এই প্রসঙ্গে একটি বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করছি।
২০০৬ সালে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ থেকে অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের প্রতিক্রিয়ায় যমুনা নদীতে নাব্য আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছিল। ফলে চট্টগ্রাম থেকে তেল ভর্তি ইনল্যান্ড অয়েল ট্যাঙ্কারগুলো বাঘাবাড়ী ঘাটে ভিড়তে পারছিল না। বিপিসির সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, বাঘাবাড়ীর পরিবর্তে উত্তরবঙ্গের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল খুলনার দৌলতপুর ডিপোতে পাঠাব এবং সেখান থেকে তেলের ট্যাঙ্কারের (বাউজার) মাধ্যমে বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের পঞ্চগড় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। কিন্তু, সমস্যা বাধল অন্যত্র। এই যে কয়েকশ’ কিলোমিটার ঘুরপথে নদী এবং রাস্তা দিয়ে তেল পাঠানো হবে, তাতে লিটারপ্রতি বিপিসি’র খরচ বাড়বে অন্তত দুই টাকা। এমনিতেই বিপিসি তখন ভর্তুকির চাপে নিদারুণ অর্থকষ্টে ভুগছে। বকেয়ার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো জ্বালানি তেল আমদানির ঋণপত্র খুলতে অস্বীকৃতি জানানোয় আমাকে বিকল্প উত্স থেকে অর্থের সংস্থান করতে হচ্ছে।
ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, কুয়েত সরকার এবং একটি বিদেশি ব্যাংক সেই কঠিন সময়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে যথেষ্ট সহায়তা করেছিল। এমতাবস্থায়, ফাইন্যান্স ডিরেক্টর আমাকে বললেন, লিটার প্রতি অতিরিক্ত দুই টাকার বোঝা বহন করা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সম্ভব নয়। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দেশের জনগণকে সমস্যার গভীরতা যথাযথ স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করে কেবল শুষ্ক মৌসুমের জন্য উত্তরবঙ্গে লিটার প্রতি এক টাকা করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জানাব। বাকি এক টাকা বিপিসির ভর্তুকির সঙ্গে যুক্ত হয়ে না হয় সরকারের লোকসান খানিকটা বাড়বে। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে ছিলেন। শুষ্ক মৌসুমের মাত্র তিনটি মাসের জন্য অনন্যোপায় হয়ে লিটার প্রতি একটি টাকা মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণায় মৌচাকে যেন ঢিল পড়ল। তখন সংসদ অধিবেশন চলছিল। সেখানে বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, জিল্লুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের সব সংসদ সদস্য এক টাকা দাম বাড়ানোর জন্য আমার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়লেন। এদের মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তার স্বভাবসুলভ কায়দায় সংসদের ভেতরে-বাইরে যেসব রুচিবিহর্গিত মন্তব্য করতে লাগলেন, তার জবাব দেয়া কোনো ভদ্র সন্তানের কর্ম নয়। মাত্র এক টাকার জন্য সে এক মহা হুলুস্থুল অবস্থা।
সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক চলাকালীন বিএনপি’র একজন নীতিনির্ধারক বাধ্য হয়ে ফোনে আমাকে পরামর্শ দিলেন মূল্যবৃদ্ধি ঘোষণার কথাটা মিডিয়ার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি আখ্যা দিয়ে আমি যেন বেমালুম অস্বীকার করি। বাকিটা তিনি সংসদে সামলে নেবেন। তিনি মোবাইলে অনুচ্চ কণ্ঠে যখন এই পরামর্শ দিচ্ছিলেন, তখনও সংসদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় আমি এপার থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম। এ দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদের মতো সময়-সুযোগমত বক্তব্য পাল্টানো আমি কোনোদিনই ঠিক শিখে উঠতে পারিনি। আমার সেই বয়োজ্যেষ্ঠ শুভানুধ্যায়ীর পরামর্শের জবাবে আমি লিটারপ্রতি এক টাকা মূল্যবৃদ্ধির সব দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে তত্ক্ষণাত্ সরকার থেকে পদত্যাগ করার প্রস্তাব দিলাম। বেগম খালেদা জিয়া বিদেশে অবস্থানরত অবস্থাতে আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণে তার অসম্মতির কথা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত বিপিসি’র লোকসান বাড়িয়ে সেই এক টাকা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়ে আমাকে জোট সরকারকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে হয়েছিল।
আজ যখন ফার্নেস অয়েলের মূল্য ২০০ শতাংশ (লিটার প্রতি ৪০ টাকা) এবং সিএনজি’র মূল্য ২৬৩ শতাংশ (ঘন মিটার প্রতি ২১.৫০) বৃদ্ধি করা হচ্ছে, তখন জনগণের কথিত সেবক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সদ্যপ্রাপ্ত মন্ত্রীর ক্ষমতার আস্বাদনে বিভোর। লিটারে ৩০-৪০ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি সম্ভবত তার কাছে অতি তুচ্ছ বিষয়। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর জনগণের দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে চিন্তা করার প্রয়োজন এই রাজনীতিবিদের আপাতত ফুরিয়েছে। মহাজোটের বিশাল মন্ত্রী-উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে কতজন রেকর্ড পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধি থেকে ভাগ পেয়ে ব্যক্তিগতভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠছেন, সেটা সুরঞ্জিত বাবুরাই ভালো জানেন। মূল্যবৃদ্ধির কাহিনীর এখানেই শেষ নয়। আমার জ্বালানি উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালীন যে এলপিজি সিলিন্ডার প্রতি ৪৭৫ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে তার সরকারি মূল্য কাগজে-কলমে ৭০০ টাকা (৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি) লেখা থাকলেও ১৩০০ টাকার (২৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি) নিচে কোথাও পাওয়া দুষ্কর। মাত্র তিন বছরের মধ্যে অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন এই অবিশ্বাস্য মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণই হচ্ছে জ্বালানি খাতে শাসকগোষ্ঠীর সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গকারী দুর্নীতি ও লুটপাট।
বাংলাদেশের চল্লিশ বছরের ইতিহাসে একমাত্র মরহুম জিয়াউর রহমান ছাড়া অন্য কোনো সরকারই প্রকৃত অর্থে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সেই কারণেই জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততার কাহিনী এদেশে আজও কিংবদন্তীতুল্য হয়ে আছে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত যে চারটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল বা আছে, তার মধ্যেও বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সরকার নিঃসন্দেহে তুলনামূলকভাবে অধিকতর সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করেছে। ১৯৯৬ সাল থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের মধ্যে যে সার্বিক অবক্ষয়ের সূচনা হয়েছে, তার চূড়ান্ত রূপ এখন আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এর মধ্যে উল্লেখ করেছি জনগণের কাঁধে অসহনীয় দ্রব্যমূল্যের যে বোঝা মহাজোট সরকার মাত্র তিন বছরে চাপিয়ে দিয়েছে, তার পেছনেও রয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে অগাধ সম্পদ আহরণের কুিসত প্রতিযোগিতা। আজকের লেখার শুরুতেই বলেছি জ্বালানি খাতের বাইরে কলম যেতে দেব না, তাই কেবল এই খাতটির দুর্নীতির প্রসঙ্গে লিখেই মন্তব্য-প্রতিবেদনে সমাপ্তি টানব।
দিনবদলের সরকারের সূচনাতে মন্ত্রীদের চেহারা দেখেই জনগণ বুঝে গিয়েছিল যে, রাষ্ট্রের ভাণ্ডার থেকে লুটপাটের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জনের জন্য যোগাযোগ, বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে বিশেষভাবে বাছাই করা হয়েছে। অবাধ লুটপাটের আইনি বাধা দূর করার জন্য বিনা টেন্ডারে সরকারি কাজ বণ্টন করার নির্লজ্জ পদ্ধতি আবিষ্কারই শুধু করা হয়নি, এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার পথও একদলীয় সংসদে আইন করে রুদ্ধ করা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের পশ্চিমা দোসররা এক সময় বাংলাদেশে সুশাসন নিয়ে তাদের অতি-উত্সাহের ঘটা দেখালেও সেক্যুলার সরকারের সর্বব্যাপী দুর্নীতির মহোত্সবের সময় একই গোষ্ঠী নীরবতা পালন করে প্রকারান্তরে উত্সাহ জুগিয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতুতে অর্থায়নও স্থগিত হতো না, যদি না শেখ হাসিনা প্রফেসর ইউনূসের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের নির্দেশ অবজ্ঞা করতেন। নোবেল পুরস্কার না পাওয়ার মনঃকষ্টে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছেন। মার্কিন প্রশাসন এতদিনে সম্ভবত এটাও বুঝে গেছে যে, শেখ হাসিনার কাছে ভারতীয় স্বার্থই সর্বদা প্রাধান্য পাবে।
সকলেই মোটামুটি অবগত আছেন যে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের ট্রাস্টি বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য হয় মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনার দোসর অথবা তার প্রতি ব্যক্তিগতভাবে সহানুভূতিশীল। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির স্বামী অ্যাডভোকেট তৌফিক নেওয়াজ, বিএনপি ও জিয়া পরিবারের চরম বিরোধী পত্রিকা ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল চক্রবর্তী যে সংগঠনের ট্রাস্টি, তাদের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা প্রত্যাশা করার মতো নির্বোধ বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে স্বল্পসংখ্যক হবেন বলেই আমার ধারণা। স্বাভাবিকভাবেই এই আমলে দুর্নীতির প্রকৃত ভয়াবহ চিত্রের অতি সামান্যই টিআইবি’র বিভিন্ন প্রতিবেদনে গত তিন বছরে উঠে এসেছে। ফলে সরকারের পক্ষে বিনা টেন্ডারে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে একের পর এক কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্রের চুক্তি করতে কোনো অসুবিধাই হয়নি। দুর্নীতি সংক্রান্ত বিষয়ে বর্তমান সরকারের দুই বহুল আলোচিত ব্যক্তি ফারুক খান এবং আবুল হোসেনের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে একের পর এক ভাড়ায় বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এক কথায় বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়কে আগামী নির্বাচনের অন্যতম Fund Collector-এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ৬ টাকার বিদ্যুত্ ১৪ থেকে ১৮ টাকা প্রতি ইউনিট দরে কিনে দেশের অর্থনীতি সম্মিলিতভাবে রসাতলে পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুত্ উপদেষ্টা ও অর্থমন্ত্রী।
আজ যে জ্বালানি তেলের মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো হয়েছে, তার মূলেও রয়েছে এসব কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র সংক্রান্ত লুটপাট। অধিকাংশ বিদ্যুত্ কেন্দ্র জ্বালানি তেলনির্ভর হওয়ায় এখন দেশের জনগণকেই বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্যের দায় নেয়ার অতিরিক্ত সেই তেলের ভর্তুকির মূল্যও পকেট থেকে মেটাতে হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের ভোট চুরি করা সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মুহিত এর মধ্যে আগামী তিন বছর অব্যাহতভাবে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণাও দিয়েছেন। অথচ, বেসরকারি খাতে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের এই ভ্রান্ত নীতি যে পরিণামে দেশের অর্থনীতির সর্বনাশ ডেকে আনবে, সেই সাবধানবাণী গ্রেফতার হওয়ার আগে আমার বিভিন্ন লেখা ও টকশোতে বহুবার উচ্চারণ করেও সরকার অথবা জনগণের সংবিত্ ফেরাতে পারিনি।
সরকারের প্রথম থেকেই সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়ার কারণে আমার দেশ ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়েছে এবং সর্বাত্মক দলীয়করণের পাঁকে নিমজ্জিত বিচার বিভাগের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন আমাকে কারান্তরালে অত্যাচারিত হতে হয়েছে। আজও আমার দেশ’র পাঠক সরকারের জ্বালানি খাতে দুর্নীতির চিত্র সংবলিত লেখাটি যখন পড়ছেন, সেই মুহূর্তেও সিএমএম আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থেকে বিটিআরসি’র মানহানি মামলায় আমার বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের নাটক উপভোগ করছি। ফ্যাসিবাদী সরকারের এসব নির্যাতন আমার দেশ পরিবারকে অবদমিত করতে অবশ্য পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। আমরা অব্যাহতভাবে দেশের জনগণকে যাবতীয় দুর্নীতির তথ্য দেয়ার চেষ্টা করে গেছি। তবে, দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করা একদা বীর জাতি আজ মহাজোট সরকারের পেটোয়া বাংলাদেশী পুলিশ বাহিনীর অ্যাকশনের সামনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গৃহাভ্যন্তরে মা, বোন, স্ত্রীর আঁচলের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। চারদিকে নির্জীব জনতার কাপুরুষতা দর্শনে মাঝে মাঝে মনে হয়, মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই বীরত্বগাঁথা কি কেবলই স্বপ্ন ছিল? কোন কালে ঘি খেয়েছিলাম, তার সুবাস এখনও হাত থেকে শোঁকার ব্যর্থ চেষ্টার মতো করেই সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একদা প্রতিবাদী, আদর্শবান তরুণদের আজ সর্বত্র খুঁজে বেড়াচ্ছি।
মনে পড়ছে ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে বুয়েটে আমার প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছিল। ওইদিনই ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নির্বিচার বোমা বর্ষণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে শেখ মুজিব সরকারের পুলিশের গুলিতে ঢাকা কলেজের মতিউল ও কাদের জীবন দিয়েছিল। তাদের দু’জনকে ভিয়েতনাম সরকার জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এই গুলিবর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তত্কালীন ডাকসু ভিপি এবং সিপিবির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজীবন সদস্য পদের কাগজ পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তীকালে অবশ্য সেলিম সাহেবরা আওয়ামী লীগের বি-টিম হয়ে গণধিকৃত বাকশালে যোগদান করেছিলেন। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমদের আওয়ামী লীগ প্রীতিতে এখনও যে ভাটা পড়েনি, সেটা ক’দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সিপিবি’র আলোচনা সভার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে।
আজ ভারতীয় সীমান্তরক্ষীর গুলিতে নিহত আমার কন্যাসম ফেলানীর লাশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় নির্মমভাবে দিনের পর দিন ঝুলে থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছাত্র-শিক্ষকদের হাততালি কুড়িয়ে যান। নোবেল বিজয়ী বয়ঃবৃদ্ধ অমর্ত্য সেন বাংলা একাডেমীতে এসে বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে সমঝোতা না করলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হুমকি দিয়ে যান। আধিপত্যবাদের এসব এজেন্টদের প্রতিরোধের পরিবর্তে এ দেশের ডিজিটাল যুগের তরুণরা সব কানে আইপি-থ্রি লাগিয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনে মশগুল হয়ে আছে। যে দেশে তরুণরা জুলুমের প্রতিবাদ করতে ভুলে যায়, নির্লিপ্ত থাকে অথবা ভয় পায়, সে দেশের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে জনদুর্ভোগ লাঘবে মাঠে নামার পরিবর্তে আঁতাতের মাধ্যমে বিরোধীদল ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে রয়েছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে গণআন্দোলন গড়ে তোলার পরিবর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে তোষণ করেই কেবল ক্ষমতায় যাওয়া যাবে, এমন আত্মবিনাশী থিসিসের প্রবক্তারা সম্ভবত বর্তমান বিরোধী দলসমূহের প্রধান নীতিনির্ধারকের ভূমিকা পালন করছেন। ভারতকে করিডোর দেয়ার জন্য তিতাস নদীর ভেতরে বাঁধ দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে বহমান নদীটিকে মেরে ফেললেও বিএনপি থেকে আজ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ পর্যন্ত উত্থাপিত হয়নি। অন্যদিকে টিপাইমুখে বাঁধ দিয়ে পদ্মার মতো মেঘনা নদী অববাহিকাকেও ধ্বংস করার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। এমন ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ ভারতের চিহ্নিত দালালরা টেলিভিশনে প্রতিদিন আমাদের ভারতপ্রেমের নসিহত দিয়ে চলেছেন।
দেশের এই সর্বব্যাপী হতাশার মধ্যে আজও একমাত্র তরুণরাই পারে আবার ১৯৭১ সালের মতো গর্জে উঠে দুর্নীতিবাজ, লুটেরা সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের পদলেহী শাসকশ্রেণীকে উত্খাত করে প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। সেই এক এগারো থেকেই এই জনজোয়ার দেখার আশায় প্রতীক্ষা করে আছি। ২০১২ সালে অন্তহীন প্রতীক্ষার অবসান হোক—এটুকুই প্রত্যাশা। বাংলাদেশের বিশিষ্ট সমাজচিন্তক, মনীষী লেখক বদরুদ্দীন উমরের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি যে বক্তৃতাটি দিয়েছেন, তারই একটি ক্ষুদ্র অংশ উদ্ধৃত করে আজকের লেখায় সমাপ্তি টানব। ওই অনুষ্ঠানে বদরুদ্দীন উমর বলেছেন, “এই যে অসহিষ্ণুতা, যেটাকে বলা যেতে পারে এক ধরনের ঔদ্ধত্য, এটা কিন্তু একটা সংগ্রামের সময় থাকে। যেমন—ফরাসি বিপ্লবের সময় Robespierre-এর সেই বিখ্যাত উক্তি আছে—[Audacity, Audacity, more Audacity. আসল উক্তিটা : We need audacity yet more audacity, and always audacity.]
ঔদ্ধত্য, ঔদ্ধত্য আরও ঔদ্ধত্য! সে সময় কিন্তু ঔদ্ধত্যের প্রয়োজন হয়। সেখানে ঔদ্ধত্য না দেখিয়ে আমি যদি বিনয়াবনত হই, তাতে কিন্তু কাজ হচ্ছে না। আমাদের দেশের অবস্থা আজ এমন দাঁড়িয়েছে যে, এখানে অসহিষ্ণু হওয়ার প্রয়োজন আছে।”
ইমেইল : admahmudrahman@gmail.com

মন্তব্য প্রতিবেদন : ক্রুসেডের লক্ষ্য এখন বাংলাদেশ


মাহমুদুর রহমান
এগার শতকের শেষ দশক থেকে পরবর্তী প্রায় দু’শ’ বছর ধরে ইউরোপীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে লাগাতার যুদ্ধ চালিয়ে গেছে তাকেই ক্রুসেড নামে অভিহিত করা হয়েছে। ১০৯৫ সালে পোপ উরব্ান-২ (Pope Urban II) বাইজেনটাইন সম্রাট এলেক্সিয়াস-১ (Emperor Alexius I)-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইউরোপের প্রধানত লাতিন খ্রিস্টানদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী গঠন করে প্রথম তুর্কি সেলজুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে অবতীর্ণ হন এবং শেষ পর্যন্ত ১০৯৯ সালে তখন পর্যন্ত মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণাধীন পবিত্র জেরুজালেম নগরী অধিকার করতে সক্ষম হন। প্রকৃতপক্ষে মুসলমানের অর্ধচন্দ্রের (Crescent) বিরুদ্ধে খ্রিস্টীয় ক্রসের (Cross) যে আগ্রাসন তাকেই লাতিন ইউরোপ ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ নাম দিয়ে মধ্যযুগে ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এসব তথাকথিত ধর্মযুদ্ধ তত্কালীন সময়ে খ্রিস্টান ধর্মগুরু পোপের অনুমোদন ও নির্দেশক্রমেই পরিচালনা করা হতো। প্রথম ক্রুসেডে মুসলমানরা জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত হলেও ১১৮৭ সালের তৃতীয় ক্রুসেডে সুলতান সালাদিনের নেতৃত্বে মুসলমান বাহিনী জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করে। ক্রুসেডের হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস বর্তমান দশকে নতুন করে প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে। নবরূপে ক্রুসেডের ধারণার সূত্রপাত অবশ্য ১৯৯৩ সালে স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তার সভ্যতার সংঘাত (Clash of Civilizations) তত্ত্বের মাধ্যমেই করে গেছেন। গত এক দশক ধরে আফগানিস্তান ও ইরাকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী যৌথবাহিনীর যে আগ্রাসন চলছে সেটি মূলত মধ্যযুগীয় ক্রুসেডেরই আধুনিক সংস্করণ মাত্র। ২০০১ সালে মার্কিনিদের যুদ্ধ প্রস্তুতিকালীন সময়ে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ক্রুসেড শব্দটি একবার উচ্চারণও করেছিলেন। আন্তর্জাতিক মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে তার উপদেষ্টারা আর দ্বিতীয়বার তাকে ওই শব্দটি উচ্চারণ করতে না দিলেও স্বঘোষিত Born again Christian জর্জ বুশ (জুনিয়র) যে বর্তমান বিশ্বকে ক্রুসেডের আলোকেই দেখে থাকেন এটা তার সামগ্রিক বক্তব্য, আচার-আচরণে পরিষ্কার। স্ক্যানডিনেভিয়াভুক্ত রাষ্ট্রসমূহসহ আধুনিক ইউরোপের অনেক দেশেই ইসলাম বিরোধিতা ক্রমেই প্রকট রূপ ধারণ করছে। ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্রের ইসলামবিদ্বেষীরা রীতিমত উন্মাদের মতো আচরণ করছে। ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু বর্তমান পোপ বেনেডিক্ট-১৬ তার প্রকাশ্য ইসলামবিরোধী বক্তব্যের জন্য কিছুদিন আগেও যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছেন। বিশ্ব রাজনীতির উপরোক্ত বাস্তবতার আলোকে এবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
আমার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র মুসলমান প্রধান রাষ্ট্র যেখানে সরকারি মদতে গণমাধ্যমে অবিরত ইসলামবিরোধী কুিসত প্রচার চালানো হয়। আমাদের জাতীয় দিবসগুলোতেও ঐক্যের বাণী প্রচারের পরিবর্তে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো হয়ে থাকে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই দুষ্কর্মটি যারা করে থাকেন তাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আবার মুসলমান পরিবার থেকেই এসেছেন এবং পিতৃ প্রদত্ত মুসলমান নাম ধারণ করেই আছেন। পিতা-মাতার ধর্মবিশ্বাসের প্রতি এই অপরিসীম বিরাগ সৃষ্টির পেছনে ঠিক কোন দর্শন কাজ করেছে তা আমার জানা নেই। তবে বাংলাদেশকে যে একটি শ্রেণী মুসলমানপ্রধান, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আর দেখতে চায় না, সেটি ক্রমেই প্রমাণিত হচ্ছে। তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একাধারে বীরত্বপূর্ণ ও ট্র্যাজিক ঘটনাবলীকে দীর্ঘদিন ধরে সাফল্যের সঙ্গে তাদের উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চলেছে। পশ্চিম পাকিস্তানের পুঁজিপতি, সামন্তবাদী গোষ্ঠী ও সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামকে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চললেও দৃশ্যত প্রচারণার তীব্রতা বেড়েছে নব্বইয়ের দশক থেকে। স্যামুয়েল হান্টিংটনের চরম ইসলামবিদ্বেষী সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের উদ্ভবও যে প্রায় একই সময়ে হয়েছে এই বিষয়টিকে কেবল কাকতালীয় ভেবে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। আগেই বলেছি হাজার বছর আগে ইসলামিক ক্রিসেন্টকে মোকাবেলা করার জন্যই খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা ক্রুসেড আবিষ্কার করেছিলেন। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে নির্যাতনকারী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্বল্পসংখ্যক এ দেশীয় দালালগোষ্ঠী মুসলমান ধর্মাবলম্বী হওয়ার বিষয়টিকে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বর্তমান দোসররা সুযোগ হিসেবে নিয়ে ইসলামের সব প্রতীককে জনগণের কাছে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে চলেছে।
ইসলামের আদিযুগ থেকেই চাঁদ-তারা ইসলামী আন্দোলনের প্রতীক রূপে এই ধর্মাবলম্বীদের পতাকায় প্রদর্শিত হয়ে আসছে। এই প্রতীক কিংবা সবুজ রং পাকিস্তানের পতাকায় আছে বলেই এগুলো সে দেশটির সম্পত্তি হয়ে যায়নি। প্রসঙ্গক্রমে, সমাজতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে অনেক দেশেই যে কাস্তে-হাতুড়ি ব্যবহারের রেওয়াজ রয়েছে সেটিও পাঠক জানেন। মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় রং ছিল সবুজ এবং অনেক হাদিসে সবুজকে বেহেস্তিদের পোশাকের রং হিসেবে বর্ণনা করা আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো পবিত্র কোরআন শরীফের সূরা আদ দাহার-এর ২১ নম্বর আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ্তায়ালা জান্নাতবাসীদের পোশাকের যে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন তা নিম্নরূপ :
‘তাদের আবরণ হবে চিকন সবুজ রেশম ও মোটা সবুজ রেশম।’
দাড়ি রাখা ইসলাম ধর্ম পালনে অপরিহার্য না হলেও আমাদের প্রিয় নবী যেহেতু দাড়ি রাখতেন, কাজেই এটি আমরা সুন্নত হিসেবেই পালন করে থাকি। নামাজ আদায় করার সময় টুপি পরে মাথা ঢেকে রাখাও আমাদের ধর্ম পালনেরই রীতি। মস্তক আবৃত করার এই রীতি অন্যান্য সেমেটিক ধর্মেও রয়েছে। ইহুদি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এক বিশেষ ধরনের টুপি (Skull Cap) পরাকে তাদের ধর্ম পালনের অত্যাবশ্যকীয় আচার বলেই মনে করে। খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা যথেষ্ট জাঁকজমকপূর্ণ টুপি পরেই রোববার চার্চে ধর্মোপদেশ প্রদান করে থাকেন। অথচ, বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমে আজ যুদ্ধাপরাধীর কল্পিত চেহারা দেখাতে গিয়ে মুখে দাড়ি এবং মাথায় সবুজ রংয়ের চাঁদ-তারাখচিত টুপি পরিহিত এক রক্তলোলুপ, বীভত্স দানবকে তরুণ প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করছে। পশ্চিমা মিডিয়াতেও সবুজ রংকে সচরাচর নেতিবাচকভাবেই প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। হলিউডের অধিকাংশ ছবিতে শয়তানকে (Devil) সবুজ দেহাবরণবিশিষ্ট দেখানো হয়। এ দেশেও রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী দেখানোর নামে ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট উভয় মিডিয়াতেই ইসলামের চিহ্নসমূহকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের মতো করেই নেতিবাচকভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে। এদিকে আবার সরকারের সব মহল থেকেও টুপি, দাড়ি এবং হেজাবকে জঙ্গিবাদের চিহ্ন হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কট্টর সাম্রাজ্যবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী জর্জ বুশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একজন স্বঘোষিত সাথী। মন্ত্রিসভায় তার সহকর্মী, আইনমন্ত্রী বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাগুলোকে জঙ্গিবাদের প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ইসলাম ধর্মকে জঙ্গিবাদের জন্য দায়ী করে বক্তব্য দেয়ার পরও স্বপদে বহাল রয়েছেন। সরকার এবং তাদের সমর্থকদের কার্যকলাপে মনে হতে পারে অন্তত এদেশে ইসলামকে পরাজিত করতে এক হাজার বছর আগের মতো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের আর কষ্ট করার দরকার নেই, বাংলাদেশে ক্রুসেড পরিচালনার দায়িত্ব এদেশের মুসলমান নামের লেবাসে ইসলামবিরোধীরাই গ্রহণ করেছে। সরকার এবং তাদের সমর্থক গণমাধ্যমের অবস্থান হলো, জামায়াতে ইসলামী এ দেশে রাজনীতি করতে পারবে না, কারণ তারা যুদ্ধাপরাধী; হিযবুত তাহরিরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে কারণ তারা সরকারের বিবেচনায় জঙ্গি; দেশ থেকে কওমী মাদ্রাসা উঠিয়ে দিতে হবে, কারণ আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী সেখানে জঙ্গি প্রজনন কারখানা রয়েছে। সোজা কথা, ইসলাম ধর্মের আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনীতি বাংলাদেশে করতে দেয়া হবে না। এ সবই বিদেশি প্রভুদের নির্দেশে ও তাদের সন্তুষ্টির জন্যই করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় বিএনপির নীতিনির্ধারকরা যদি আশা করে থাকেন যে, পশ্চিমারা বর্তমান সরকারের মতো অনুগত মিত্র ত্যাগ করে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে সমর্থন করবে তাহলে তারা এখনও বোকার স্বর্গে বাস করছেন। জামায়াতে ইসলামীও দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন তোষণ নীতি অনুসরণ করার ফল এখন ভালোভাবেই ভোগ করছে। বাংলাদেশের জনগণের উপলব্ধি করা প্রয়োজন, সপরিবারে শেখ মুজিব হত্যার জন্য আওয়ামী লীগ এক সময় সিআইএ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শেখ হাসিনার কোনো সমস্যা হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও একদা সোভিয়েতপন্থী আওয়ামী লীগকে বুকে টেনে নিয়েছে একবিংশ শতাব্দীর ক্রুসেডের সাথী হিসেবে।
ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমন্বয়ে গঠিত সাম্রাজ্যবাদী অক্ষশক্তি শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করে এবং নিজ দেশের হাজার হাজার নাগরিকের প্রাণহানি ও অঙ্গহানির বিনিময়ে ইরাক ও আফগানিস্তানে বুশ কথিত আধুনিক যুগের ক্রুসেড প্রায় এক দশক ধরে অব্যাহত রেখেছে। একবিংশ শতকের ক্রুসেডে ইরাক ও আফগানিস্তান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দেশ দুটির লাখ লাখ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে; মানব সভ্যতার আদি নিদর্শন লুটপাট করে বিজয়ীদের দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে; উভয় দেশকে চিরস্থায়ী দাসত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে। সাম্রাজ্যবাদী অভিন্ন গোষ্ঠী আজ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ইসলামিক রাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করেছে। এক নতুন ধরনের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি নিয়ে। সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় জেনারেল মইন সেনাবাহিনীকে জাতিসংঘ শান্তি মিশন থেকে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে শিখণ্ডি রূপে দণ্ডায়মান রেখে তিন বছর আগে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। ২০০৭ সালে ক্ষমতা দখলের পর মইন-ফখরুদ্দীন জুটি তাদের বিদেশি প্রভুদের নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী শক্তিকে নির্মূল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়ার তার এই হীন প্রচেষ্টায় পেছন থেকে পাশ্চাত্যের সঙ্গে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী ভারতও জেনারেল মইনকে সেই সময় প্রয়োজনীয় সমর্থন প্রদান করেছে। এক-এগারো পরবর্তী সময়ে বহুবার লিখেছি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলাম বিদ্বেষী একটি সেক্যুলার গোষ্ঠীকে অধিষ্ঠিত করার যে পরিকল্পনা ২০০২ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে প্রণয়ন করা হয়েছিল তারই একটি পর্যায় ছিল মইন-মাসুদ গংয়ের ক্ষমতা দখল। আনোয়ার চৌধুরী, বিউটেনিস, রেনাটা, ফ্রয়েন মিলিতভাবে যে কৌশল প্রয়োগ করে বাংলাদেশে চাঁদ-তারাকে পরাজিত করে বিনা খরচায় ক্রুসেডের ঝাণ্ডাকে বিজয়ী করতে পেরেছে সেখান থেকে অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রসমূহেরও শিক্ষা নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশে ইউএনডিপি’র সাবেক প্রধান এদেশ থেকে বিদায়ের পূর্বমুহূর্তে ষড়যন্ত্রের সব দায়-দায়িত্ব অবশ্য জেনারেল মইন এবং সেই সময়কার অন্যান্য সিনিয়র জেনারেলদের ঘাড়ে চাপিয়ে গেছেন। এটাই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের চিরকালের কৌশল। এক সময়ের মার্কিন মিত্র, সেক্যুলার ভাবাদর্শের সাদ্দাম হোসেনকে সপরিবারে হত্যা করতে বর্তমান বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির নীতিনির্ধারকরা কোনো রকম বিবেকের তাড়না অনুভব করেনি। রেনাটাও বাংলাদেশের দেশদ্রোহী জেনারেলকে ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করে চীনদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এক-এগারোর বিদেশি কুশিলবদের মধ্যে এখনও যিনি সর্বশেষ ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশে রয়ে গেছেন সেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ফ্রয়েন তার যাওয়ার মুহূর্তে বাংলাদেশের বিমূঢ় জনগণকে সর্বশেষ কী তথ্য দিয়ে যান সেটি জানার জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছি।
বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের প্রচার চালিয়ে এদেশের জনগণের একটি বড় অংশের ধর্মবিশ্বাস দুর্বল করে দিয়েই সাম্রাজ্যবাদীরা রক্তপাতহীন ক্রুসেডে জয়লাভ করেছে। এখন সেই জয়কে সংহতকরণের পালা চলছে। বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের নমুনা প্রতিদিনই দেখতে পাচ্ছি। যে বিভ্রান্ত সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ তাদের উগ্র সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য পূরণে সফল হয়েছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সর্বপ্রথম সেই সেনাবাহিনীকেই চরম আঘাত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন পূর্বকালে প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের লিখিত একটি নিবন্ধের উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি মৌলবাদী প্রতিষ্ঠান রূপে চিত্রিত করেছিলেন। সেই লেখায় তিনি সেনাবাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনারও আগাম ইঙ্গিত প্রদান করেছিলেন। সজীব ওয়াজেদ জয় কোন দেশের নাগরিক তা জাতির কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। তার স্ত্রী মার্কিন নাগরিক এ তথ্য আমরা জানি। কিন্তু, তিনি খ্রিস্টান না ইহুদি ধর্মাবলম্বী তা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। কাজেই তথাকথিত বিডিআর বিদ্রোহের নামে ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার পিলখানায় নির্বিচার সেনা অফিসার হত্যাকাণ্ডকে শুধু কাকতালীয় বিবেচনার কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
বিডিআর হত্যাকাণ্ড- পরবর্তী চৌদ্দ মাসে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি ইতিহাসের ঘৃণ্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কলঙ্কিত হয়েছে। বিরোধী দল এবং মতকে দমন করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র তার সব নির্মমতা ও ভয়াবহতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে চলছে, নারীর সম্ভ্রম ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের মাত্রা এক-এগারোর সরকারকে অতিক্রম করেছে, ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসীদের ওপর নিপীড়ন রোমান যুগে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের করুণ অবস্থা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, বিচারের বাণী আর নিভৃতে নয় প্রকাশ্যেই কেঁদে চলেছে। যে বিদেশি কূটনীতিকরা উপদেশ-নির্দেশ দিয়ে চার দলীয় জোট সরকারকে পাঁচ বছর একেবারে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল, তারাই হঠাত্ করে ভিয়েনা কনভেনশনের প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রে শুনতে পাই, দূতাবাসের বিভিন্ন গোপনীয় বৈঠকে এরা নাকি বর্তমান সরকারের ইসলামবিরোধী সার্বিক কর্মকাণ্ডে যারপরনাই সন্তুষ্টি প্রকাশ করে থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত চিহ্নিত চরম দক্ষিণপন্থী, ইসলামবিদ্বেষী দেশগুলোর কূটনীতিকরা বর্তমান সরকারকে পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী করানোর কলাকৌশল প্রণয়ন নিয়ে আগাম আলাপ-আলোচনা আরম্ভ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সংসদ, সচিবালয়, আদালত, সেনাবাহিনী, নির্বাচন কমিশন, দুদক ইত্যাদির ভূমিকা এখন সুতোয় টানা পুতুলের চেয়ে বেশি কিছু নয়। এমতাবস্থায়, রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হলে সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি প্রকৃত দেশপ্রেমিক, বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত, ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী, গণতান্ত্রিক মোর্চাকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসানোর বিকল্প নেই। প্রথম ক্রুসেডে জেরুজালেম হারানোর পর সেই পবিত্র নগরী তৃতীয় ক্রুসেডে সুলতান সালাদিনের নেতৃত্বে পুনরুদ্ধার করতে মুসলমানদের প্রায় একশ’ বছর অপেক

মন্তব্য প্রতিবেদন : ভারতবন্ধুরা কাছা খুলে নেমেছে



মাহমুদুর রহমান
সুশীল(?) দৈনিক প্রথম আলো এবং টাইমস অব ইন্ডিয়া গত সপ্তাহখানেক ধরে খানিকটা আকস্মিকভাবেই ভারত-বাংলাদেশ আবহমান কালের ‘বন্ধুত্বের’ স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিশেষত তরুণদের মগজ ধোলাইয়ের কাজে যৌথভাবে মাঠে নেমেছে। তাদের ভাষায়, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীবন্ধন অধিকতর জোরদার করার জন্যই এই যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই উপলক্ষে প্রকাশিত বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক পত্রিকাটির গত বুধবারের সংখ্যাটি পাঠ করে এক প্রকার অনাবিল আনন্দ উপভোগ করেছি।
পাঠকের স্মরণে থাকার কথা যে, ২০০৭ সালে প্রথম আলো ও তাদের সহযোগী ইংরেজি পত্রিকা দি ডেইলি স্টার জেনারেল মইন উ আহমেদের নেতৃত্বাধীন ভারতপন্থী সামরিক সরকারের Friend, Philoshoper, Guide-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এদেশের রাজনীতির বহুল বিতর্কিত ‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলার শুধু সমর্থনই পত্রিকা দু’টি ও সম্পাদকদ্বয় করেননি, এর পক্ষে জনমত গঠনের জন্যও সেই সময় সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাদের সেই কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশের বিশিষ্টজনরা গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি করেছেন। এবারের একুশে বইমেলায় ‘জেল থেকে জেলে’ ও ‘কার মান কখন যায়’ নামে আমার দুটি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কসহ অন্যান্য বিষয়ে এদেশের সুশীল(?) সমাজের নেতৃত্ব প্রদানকারী এবং সবচেয়ে শক্তিশালী মিডিয়া হাউসের কাজ-কারবার নিয়ে উভয় গ্রন্থেই আমার নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণ রয়েছে।
তবে অতীতচারিতা নয়, আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য মূলত প্রথম আলোর সর্বশেষ মগজ ধোলাই প্রকল্প সম্পর্কে জনগণকে সাধ্যমত সচেতন করে তোলা। বুধবারের সংখ্যায় ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব প্রগাঢ় করার যৌথ উদ্যোগ চালু হওয়ার পর থেকে পুরো সপ্তাহ ধরে প্রথম আলোতে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ এবং প্রচারণা চলছে।
পত্রিকাটির ঘোষণা অনুযায়ী কথিত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উত্সব গত বৃহস্পতিবার আরম্ভ হয়ে আজ ২৯ ফেব্রুয়ারি শেষ হচ্ছে। তবে আমার ধারণা, বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে কৃতজ্ঞতা ও বন্ধুত্বের এইসব অমিয় বাণী দেশবাসীকে শুনে যেতে হবে। আগাম প্রচারণার ধরন দেখে মনে হচ্ছে ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে একই গোষ্ঠীর ব্যবহৃত সফল মিডিয়া কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও লেখালেখি করা যাবে। আপাতত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীবন্ধনে ফিরে যাই।
গত বুধবারের প্রথম আলোতে যে আবেগাপ্লুত ভাষায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার আবহমান ‘বন্ধুত্বের’ কথা বলে হাহাকার করা হয়েছে, তাতে এ দেশের চিহ্নিত ভারতপন্থীদের কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত রূপটিই যেন ফুটে উঠেছে। আমার আনন্দ অনুভবের কারণটা ওখানেই। ক্রমেই জেগে ওঠা বাংলাদেশের তরুণদের গভীর দেশপ্রেমের প্রকাশ বোধহয় তাদের প্রভুদের অন্তরে পর্যন্ত কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। উপায় খুঁজে না পেয়ে তাই নতুন করে ঘুম-পাড়ানিয়া গানের আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের বাংলাদেশীয় দোসররা। আমাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবেশীর সঙ্গে মৈত্রীবন্ধন এগিয়ে নেয়ার স্লোগান নিয়ে প্রথম আলোর বুধবারের সংখ্যায় দেশের তিন বিশিষ্ট সুশীল(?) বুদ্ধিজীবী, সম্পাদক কলম ধরেছেন। তাদের প্রত্যেকের লেখা নিয়েই একে একে আলোচনা করব। তবে, শুরু করছি ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ‘লঙ্ঘিতে হবে অনাস্থার দুর্গম গিরি’ শিরোনামে লেখাটি দিয়ে। অত্যন্ত উচ্চমার্গের বাংলায় লিখিত কলামটি পড়ে যে কোনো পাঠকেরই মনে হতে পারে, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার সব দায় কেবল হতভাগা বাংলাদেশীদের। তার লেখা থেকেই বরঞ্চ উদ্ধৃত করি!
“কথায় আছে তুমি প্রতিবেশী নির্বাচন করতে পার না। আমরা ভারত বিভাগের সময় প্রতিবেশী চিনে নিয়েছি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সময় প্রতিবেশীরাই বাংলাদেশের জনগণকে আশ্রয় দিয়েছে এবং স্বাধীন হতে সাহায্য করেছে। এ এমন এক আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত যে, ত্রিপুরায় সে দেশের নাগরিকের চেয়ে শরণার্থীর সংখ্যা বেশি হয়ে গিয়েছিল। এমন হৃদ্যতা আমরা হেলায় হারাতে যাব কার জিদে, কার স্বার্থে, কার ছলে, কার কর্মে।...
প্রতিবেশীরা যদি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইন রীতি মেনে তাদের স্বীয় ভূমিকে কাঁটাতারের বেড়া বা ‘মাজিনো’ লাইন দিয়ে ঘিরে ফেলতে চায়, আমরা সেখানে ‘না’ বলার কে! তবে দেশের সীমান্তে বা অভ্যন্তরে আইনের নামে গুলি করে যে নরহত্যা ঘটে, তা অতীব দুঃখজনক। এরূপ ঘটনা শুধু দুঃখবহ নয়, লজ্জাকরও বটে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে।...”
বিস্ময়করভাবে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের লেখার কোথাও ভারতের পানি, ভূমি, মাদক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, বেরুবাড়ীর চুক্তিভঙ্গ, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি বাহিনী সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেয়াসহ সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবেশীর অন্যান্য অপকর্ম এবং বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার প্রদানে সে দেশের শাসকশ্রেণীর অনীহা ও সঙ্কীর্ণতার কোনো উল্লেখ নেই। এক ১৯৭১ সালে সহায়তার জন্য আমাদেরকে সহস্র বছরের দাসত্ব গ্রহণের একতরফা আহ্বানই ফুটে উঠেছে লেখাটির সর্বাঙ্গে। ভিনদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এত আগ্রহ ও সমর্থন যে ভারতীয় শাসকশ্রেণীর, তারাই আবার কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্যের জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ৬৫ বছর ধরে সেনাবাহিনীর বুটের নিচে পিষ্ট করে রাখে কোন আদর্শ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে—এই যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করলে আমার বিরুদ্ধে বোধ হয় ভারত-বিরোধিতার অভিযোগ তুলবেন না বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীবন্ধনের উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তার পেছনে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ যে ক্রিয়াশীল থেকেছে, এই সত্য যারা এ দেশের জনগণকে ভুলিয়ে দিতে চান, তাদের বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষশক্তি হিসেবে বিবেচনা করার উপায় নেই। ১৯৭১ সালের পাকিস্তানপন্থী রাজাকারদের সঙ্গে এদের চরিত্রগতভাবে কোনো পার্থক্য নেই। তখনকার রাজাকাররা পিন্ডির কবল থেকে আমাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করেছে, আর চল্লিশ বছর বাদের দিল্লির পদলেহী গোষ্ঠী বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিরোধিতা করছে।
বিচারপতি হাবিবুর রহমান অন্যের জিদ, ছল, স্বার্থ ও কর্মে ভারতমাতার হৃদ্যতা হেলায় না হারানোর জন্য দেশবাসীকে নসিহত করেছেন। একই লেখার অন্য এক স্থানে তিনি হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের কর্তাব্যক্তিদের মহানুভবতা ও বিশাল হৃদয়েরও জয়গান গেয়েছেন। তার লেখা পড়ে ধারণা হতে পারে, মুসলমান পরিবারের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে এই বিরল গুণগুলো থাকে না, তারা সবাই স্বার্থপর ও ক্ষুদ্র হৃদয়ের মানুষ। অবশ্য এমনও হতে পারে লেখক তার নিজ পরিবারে কোনো বিশাল হৃদয়ের মানুষ খুঁজে পাননি। যাই হোক, আমি যতদূর জানি বিচারপতি হাবিবুর রহমান জন্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গেরই নাগরিক। ১৯৪৭ সালের তারই কথিত ভারত বিভাগের (স্বাধীনতা অর্জন নয়) পর তিনি সম্ভবত সপরিবারে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর থেকে পালিয়ে এপারের রাজশাহীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পূর্বপুরুষের ভিটা ছেড়ে আসার সময় হিন্দু কর্তাদের মহানুভবতার কথা কেন তার স্মরণে পড়েনি, এ এক পরম বিস্ময়। আজন্ম পরিচিত ও মহত্ সব প্রতিবেশীদের ছেড়ে বাংলাদেশের অজানা ভূমিতে হিজরত করতে কে তাকে বাধ্য করেছিল? তার মতো অগাধ পাণ্ডিত্যসম্পন্ন ব্যক্তি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র আদর্শে মহীয়ান ভারতে থেকে গেলে নিশ্চয়ই সে দেশেরও প্রধান বিচারপতির আসন অলঙ্কৃত করতেন, রাষ্ট্রের শীর্ষ নির্বাহীও হতে পারতেন বাংলাদেশের ন্যায়। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা সংখ্যায় ২৫ শতাংশ হলেও সরকারি চাকরিতে আজ পর্যন্ত ৩ শতাংশ অতিক্রম করতে না পারার ব্যর্থতার জন্যও বিচারপতি হাবিবুর রহমান সম্ভবত সেখানকার মুসলমানদের অশিক্ষা ও মেধাশূন্যতাকেই দায়ী করবেন। শিক্ষা কিংবা মেধার সেই অভাব তার তো নিশ্চয়ই ছিল না। ভারত ছেড়ে আসার পর সেদেশের গুণকীর্তনের মধ্যকার স্ববিরোধিতা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের মতো একজন পণ্ডিত ব্যক্তির নজর এড়িয়ে যাওয়া বিস্ময়কর ঠেকেছে।
সীমান্তে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার মধ্যেও লেখক আপত্তিকর কিছু খুঁজে পাননি। সত্যিই তো, তাদের জমিতে তারা তারের বেড়া কেন, কংক্রিটের দেয়াল তুললেও-বা আমরা বলার কে? কিন্তু কথা হলো সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া এবং মৈত্রীবন্ধন কি হাত ধরাধরি করে চলতে পারে? এদিকে আবার বন্ধুর চাহিদামত বাংলাদেশকে শত খণ্ডে বিভক্ত করে করিডোর দেয়ার জন্য এই একই সুশীল(?) গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই উদগ্রীব হয়ে আছে। কাঁটাতারের বেড়া অক্ষত রেখে কোন পন্থায় করিডোর দেয়া যেতে পারে, এই প্রশ্নের জবাবও বিচারপতি হাবিবুর রহমানের লেখায় নেই। অনেক কুণ্ঠাসহকারে লেখক সীমান্ত হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন বটে, কিন্তু সেখানেও ভারতীয় হত্যাকারী বাহিনী বিএসএফের নাম ব্যবহৃত হয়নি। এ যেন মোঙ্গল বাহিনীর বাগদাদ ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস রচনা করব অথচ হালাকু খান পর্দার অন্তরালে থেকে যাবে। অথবা মার্কিন বাহিনী কর্তৃক ইরাক ধ্বংস এবং সেখানে যুদ্ধের নামে গণহত্যা ও লুণ্ঠন চালানো নিয়ে লেখালেখিতে জর্জ বুশ সিনিয়র ও জুনিয়র নাম দু’টি উল্লেখ করা যাবে না। উল্টো বিচারপতি হাবিবুর রহমান আমাদের নাগরিকদের হত্যা বন্ধে ‘সংশ্লিষ্ট সবাইকে’ সচেষ্ট হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাত্ ফেলানীকে নির্মমভাবে হত্যা করে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখার দায় ফেলানীর ওপরও খানিকটা চাপিয়েছেন বাংলাদেশের এই বিশিষ্ট ভারতপ্রেমী নাগরিক। ‘লঙ্ঘিতে হবে অনাস্থার দুর্গম গিরি’ শিরোনামের লেখাটির মূল সুর হলো বৃহত্ প্রতিবেশীর সব অত্যাচার, অবিচার বিনা প্রতিবাদে সহ্য করে এবং জাতির সব স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে হলেও আধিপত্যবাদী ভারতের সঙ্গে হৃদ্যতা আমাদের বজায় রাখতেই হবে। স্বাধীনতার চেতনার কী অপূর্ব বয়ানই না করেছেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান!
গান্ধীবাদী কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ তার লেখায় অনেকটা বাংলাদেশের জনগণের স্বঘোষিত মুখপত্র সেজে দাবি করেছেন যে, তারা নাকি ভারতের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের জন্য আকুল হয়ে আছে। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের মূল ধারার শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীরা শুধু নন, সাধারণ মানুষও যে ভারতের সঙ্গে স্থায়ী বন্ধুত্ব চায়, তা তারা গত নির্বাচনে জানিয়ে দিয়েছে।’ ২০০৮ সালের নির্বাচন যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর একটি ‘রেফারেন্ডাম’ ছিল এই চমকপ্রদ তথ্যটি সৈয়দ আবুল মকসুদের কাছ থেকেই প্রথম জানলাম। জানি না ভবিষ্যতে এটাও শুনতে হবে কিনা ২০০৮ সালের ডিজিটাল নির্বাচনে শেখ হাসিনা বিপুলভাবে জয়লাভ করায় সিকিমের মতো করে বাংলাদেশের ভারতভুক্তিও জনগণ কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে গেছে। সৈয়দ আবুল মকসুদ হয়তো ভুলে গেছেন যে ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে একই বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাহলে কি ওই দুই নির্বাচনে জনগণ শেখ হাসিনার ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিরুদ্ধেও রায় প্রদান করেছিল? নাকি শেখ হাসিনার মতো করে এখন থেকে সৈয়দ আবুল মকসুদও দাবি করবেন যে এ দেশে কেবল ১৯৯৬ এবং ২০০৮-এর নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য ও পক্ষপাতশূন্য হয়েছিল, বিএনপি যে দুই নির্বাচনে জয়লাভ করেছে সেখানে জনরায় পাল্টে দিতে যথাক্রমে সূক্ষ্ম ও স্থূল কারচুপির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বাংলাদেশের একমাত্র প্রকাশ্য গান্ধীবাদী কলামিস্টের এই আজব বিশ্লেষণ আমার অন্তত বোধগম্য হয়নি। অবশ্য, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে এসব বিষয়ে আমার জ্ঞান ও লেখাপড়াও যত্সামান্য। তবে বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীই বোধ হয় একটিমাত্র জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে দেশের তাবত্ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কোনোপ্রকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে সম্মত হবেন না। তাছাড়া ২০০৮-এর নির্বাচনেও তো প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার মহাজোটের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। সৈয়দ আবুল মকসুদের দাবি অনুযায়ী এই ভোটাররাও কি ভারতের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব পিয়াসী?
সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখাটির স্ববিরোধিতা অতুলনীয়। লেখার যে অনুচ্ছেদে তিনি বাংলাদেশের জনগণের ভারতের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের প্রবল আকাঙ্ক্ষার দাবি করছেন, তার ঠিক আগের অনুচ্ছেদের প্রথম লাইনেই লিখেছেন, অনন্তকাল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক একই রকম থাকে না। একদিকে চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের বাসনা আবার অপরদিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যে পরিবর্তনশীল সে বিষয়ে স্বীকারোক্তি, পাঠকের মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো অবস্থা একেবারে। লেখার শুরুতে বলা হয়েছে, ‘দুই দেশের অভিন্ন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হাজার হাজার বছরের। একই জাতিসত্তার মানুষ দুই দেশের নাগরিক। তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও মোটের ওপর এক।’ এখানে লেখক দুই দেশ বলতে কি বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ বুঝিয়েছেন? কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ তো বৃহত্ ভারতের একটি অবহেলিত, উপেক্ষিত রাজ্য মাত্র। আর যদি লেখক পুরো ভারত বুঝিয়ে থাকেন—তাহলে পাঞ্জাবি, তামিল, কাশ্মীরি এবং বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাহিত্য এক হয় কী করে? আমরা কি ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পরেই উর্দুর বিরুদ্ধে লড়াই করে এদেশে বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করি নাই? আরও কথা আছে। আমাদের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার কথা বলতে গিয়ে তিনি যদি পাক-ভারত উপমহাদেশ বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে পাকিস্তানের অবস্থান কোথায়? পূর্ব পাঞ্জাবের হিন্দু অধিবাসীদের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সাহিত্য মোটের ওপর এক হলে, পশ্চিম পাঞ্জাবের মুসলমান অধিবাসীদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বয়ানটা কী রকম হবে? নাকি ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুসারীদের কাছে বাবরের আওলাদ (ভারতীয় জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দের দেয়া বিশেষণ), ম্লেচ্ছ মুসলমানরা অস্পৃশ্য! পাগল প্রেমিক যেমন দয়িতার রূপ-গুণে কোনো খুঁত খুঁজে পায় না, সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখাতেও আমি তেমনই ভারত-প্রেমে দেওয়ানা একজন অন্ধ সুশীলকেই খুঁজে পেয়েছি।
যশস্বী সম্পাদক মতিউর রহমান তার লেখায় ভারতকে দরজা খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি কুশলী মানুষ। তাই বিচারপতি হাবিবুর রহমান এবং সৈয়দ আবুল মকসুদের মতো প্রেমময় আবেগের তোড়ে পুরোপুরি ভেসে যাননি। সৈয়দ আবুল মকসুদ পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণের ইতিহাস, সাহিত্য এক করে ফেললেও সাবধানী মতিউর রহমান লিখেছেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নানা অনিষ্পন্ন সমস্যার চেয়ে বড় ও ইতিহাস-নির্ধারিত বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন ইতিহাস-ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে গভীর ঐক্যের সুর। অর্থাত্ প্রেমের আকুতিতে তেমন তফাত্ না থাকলেও লেখার মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ন্ত্রিত মন্তব্য করে তথাকথিত নিরপেক্ষতার আবরণ ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। পেশাদার সম্পাদকের পরিমিতিবোধ এখানে কিছুটা হলেও ক্রিয়াশীল থেকেছে। কলকাতায় অনুষ্ঠিত মৈত্রীবন্ধন উত্সবে গিয়ে অবশ্য সম্পাদক মতিউর রহমান তার আবেগ আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অমোচনীয় আবেগে বাঁধা। আমাদের আছে অভিন্ন ইতিহাস, আছে অভিন্ন সংস্কৃতির উত্তরাধিকার।’ অর্থাত্ আবারও সেই দেহ-মনে লীন হয়ে যাওয়ার আকুতি।
তার সম্পাদিত পত্রিকাটির উদ্দেশ্য পরিষ্কার। বাংলাদেশকে যে কোনো মূল্যে ভারতীয় বলয়ের মধ্যে বেঁধে রাখতে হবে। ভারতীয় জেনারেলরা বলছেন, ১৬ কোটি মানুষের এই ভূখণ্ডটিকে আর কখনও ভারতীয় রাডারের বাইরে যেতে দেয়া হবে না। সে কাজটি তারা করবেন বন্দুক, বুলেট ব্যবহার করে। আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় এজেন্টরা মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সমান্তরালভাবে এ দেশের তরুণ সমাজের মগজ ধোলাইয়ের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজটি চালিয়ে যাবেন। তরুণদের ভারতপ্রেমে মোহাবিষ্ট করে রাখতে পারলে ভারতীয় জেনারেলদের কষ্ট করে কামান-বন্দুক ব্যবহার করতে হবে না।
প্রচারণার মুন্সিয়ানা আমরা ২০০৮ সালের নির্বাচনে এবং ভারতকে বিনাশুল্কে করিডোর দেয়ার প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ করেছি। প্রথম আলো, দি ডেইলি স্টার, চ্যানেল আই এবং সিপিডি অক্ষশক্তি যৌথভাবে প্রায় দেড় যুগ ধরে শুধু অব্যাহত প্রচারণার কল্যাণে ট্রানজিটের মোড়কে করিডোরকে হালাল করে ফেলেছে। এবার শুরু হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়ার পালা। একই চিহ্নিত গোষ্ঠী যে তাদের আগের খেলায় অবতীর্ণ হয়েছে, তার সর্বশেষ প্রমাণ গত বুধবারের প্রথম আলো। সেই এক-এগারো থেকেই সুশীলের (?) তকমাধারী ভারতপ্রেমীদের দেশবিরোধী চরিত্র উন্মোচনের চেষ্টা করে চলেছি। জেল, জুলুম, হয়রানি, হুমকি কোনো কিছুরই পরোয়া করিনি। সুশীলদের অনুকরণে কোনো সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপনের বিনিময়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তা খোঁজার বৃথা চেষ্টায় ঈমান বিসর্জন দিইনি।
ক’দিন আগে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ব্লেক বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। সেই সফরে ডেইলি স্টার কার্যালয়ে তিনি কয়েকজন সম্পাদকের সঙ্গে মিলিত হয়ে এদেশের গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও হয়রানি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সম্পাদকদের সঙ্গে সভায় মার্কিন দূতাবাস থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও সভাস্থল (Venue) নিয়ে আপত্তির কারণে সেখানে অনুপস্থিত থেকেছি। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার মিডিয়া গ্রুপের ঠিক বিপরীত মেরুতে আমার আদর্শিক অবস্থান। কাজেই মার্কিন দূতাবাসের সন্তুষ্টি অর্জনের চাইতে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতার পক্ষে কলমের লড়াই অব্যাহত রাখাই আমার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যাচ্ছে, ভারতের সেবাদাসরা শেষ পর্যন্ত কাছা খুলেই ময়দানে নেমেছে। ভয়ঙ্কর প্রতিকূলতার মধ্যেও এ দেশের তরুণদের প্রতি আবারও দেশমাতৃকার স্বাধীনতা রক্ষায় জেগে ওঠার আহ্বান জানাই। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, অর্থ ও কৌশলে প্রতিপক্ষ অধিকতর শক্তিশালী হলেও বাংলাদেশের তরুণদের জাগরণের চিহ্ন সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি। মহান আল্লাহ সহায় থাকলে ১৯৭১ সালের মতো এবারও আমরাই বিজয়ী হবো।
ইমেইল : admahmudrahman@gmail.com

মন্তব্য প্রতিবেদন : সরকারি দলের ঢাকা দখল



মাহমুদুর রহমান
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ঘোষণা দিয়েছে বিএনপিকে আগামী ১২ মার্চের কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হবে না। ওইদিনের আগেই সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা নাকি ঢাকা শহর দখল করে নেবেন বলে হুমকি দিয়েছেন আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে আমরা দখলদার বাহিনী নামে অভিহিত করতাম। ইরাক এবং আফগানিস্তানেও মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সেনাজোটকে বিশ্বের অধিকাংশ জনগণ দখলদার সেনারূপেই বিবেচনা করে। কাশ্মীর, সিকিম, নাগাল্যান্ড, মিজোরামেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্মান সম্ভবত দখলদারের ঊর্ধ্বে নয়।
কিন্তু কোনো গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রীদের সেই রাষ্ট্রের রাজধানী দখলের উদ্ভট বাসনা হতে পারে, সেটি জানা ছিল না। অবশ্য, দেশে গৃহযুদ্ধ চললে তখন হয়তো দখল-পুনর্দখলের প্রশ্ন উঠতে পারে। আওয়ামী লীগের ঢাকা দখলের এই ঘোষণাও দেশে গৃহযুদ্ধের কোনো আলামত কিনা সেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দলবলই ভালো বলতে পারবেন। মহানগর আওয়ামী লীগের ঢাকা দখলের ঘোষণা দেয়ার দিনেই প্রধানমন্ত্রী অন্য একটি অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় ২৯ এবং ৩০ জানুয়ারির বিএনপির গণমিছিলে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও রাজশাহীতে পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে পাঁচজন বিএনপি-জামায়াত কর্মী ও সাধারণ ভ্যান চালক নিহত হওয়ায় কোনোরকম দুঃখ প্রকাশের পরিবর্তে উল্টো এই ট্র্যাজেডির জন্য বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দায়ী করেছেন।
বর্তমান সরকার প্রধান ও তার তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবীদের অভিমত অনুযায়ী অপশাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের যে কোনো ধরনের প্রতিবাদই অপরাধ। হরতাল করলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রোডমার্চ করলে জ্বালানি তেল পোড়ার কারণে জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটে, গণমিছিল করলে রাস্তায় যানজট সৃষ্টি হয়, মানববন্ধন করলে পথচারীদের হাঁটার পথ রুদ্ধ হয়, জনসভা করার জন্য পল্টন ময়দান তো দূরের কথা, মুক্তাঙ্গন পর্যন্ত পাওয়া যাবে না, এরপরও বাংলাদেশ নাকি গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা শাসিত হচ্ছে! আসল কথা হলো, ভয়াবহ অপশাসনের অবধারিত প্রতিক্রিয়ায় ক্ষমতাসীনরা এখন জনগণকে রীতিমত ভয় পেতে শুরু করেছেন। জনগণ যাতে সংঘবদ্ধ হতে না পারে, সে কারণেই বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পুলিশ এবং দলীয় লাঠিয়াল বাহিনী মাঠে নামিয়ে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
অপরদিকে, গণমাধ্যমকেও নানা উপায়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, যাতে সরকারি দলের অপকর্ম সম্পর্কে দেশবাসীকে অন্ধকারে রাখা যায়। সংবাদ মাধ্যমের ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার ব্যাপারটি অবশ্য আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এড়ায়নি। বিশ্বব্যাপী স্বাধীন সাংবাদিকতার বিষয়ে পর্যবেক্ষণকারী প্যারিসভিত্তিক সংগঠন ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ তাদের ২০১১ সালের প্রতিবেদনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশের ক্রমাগত পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ আগের বছরের তুলনায় ৩ ধাপ এবং বর্তমান সরকারের ৩ বছরে সর্বমোট ৮ ধাপ পিছিয়েছে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ১২১ নম্বর অবস্থান ২০১১ তে নেমেছে ১২৯ নম্বরে। সংগঠনটি তাদের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স ২০১১-১২ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছে, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা অব্যাহতভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ গণমাধ্যমকে আক্রমণ ও বাধাগ্রস্ত করে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগ তাদের ২০০৮ সালের দিনবদলের ইশতেহারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নিম্নোক্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল;
দিনবদলের সনদ
১৯. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্য-প্রবাহ
১৯.১ সকল প্রকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্য-প্রবাহের অবাধ চলাচল সুনিশ্চিত ও সংরক্ষণ করা হবে। জাতীয়ভিত্তিক ছাড়াও স্থানীয়ভিত্তিক কমিউনিটি রেডিও চালুর উদ্যোগ নেয়া হবে।
১৯.২ সকল সাংবাদিক হত্যার দ্রুত বিচার করে প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এবং সাংবাদিক নির্যাতন, তাদের প্রতি ভয়-ভীতি-হুমকি প্রদর্শন এবং সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে।
১৯.৩ সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বিতরণে বৈষম্যমূলক নীতি, দলীয়করণ বন্ধ এবং সংবাদপত্রকে শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে তার বিকাশে সহায়তা প্রদান করা হবে।
সরকারের তিন বছরে জনগণকে ২০০৮ সালে নির্বাচনী প্রচারে প্রদত্ত অন্যান্য প্রতিশ্রুতির মতো গণমাধ্যম সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিও অবলীলায় ভঙ্গ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ঢাকা দখলের উস্কানিমূলক ঘোষণা একটি গণবিচ্ছিন্ন সরকারের আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ রূপেই সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। এই অসাড় হুমকির মাধ্যমেই প্রমাণিত হচ্ছে যে, অন্তত মানসিকভাবে রাজধানীর ওপর নিয়ন্ত্রণ মহাজোট সরকার হারিয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, শেয়ারবাজার লুণ্ঠন, অর্থনীতির বেহাল দশা এবং নতজানু পররাষ্ট্রনীতি জনগণকে সরকারের প্রতি প্রচণ্ড রকম বিরূপ করে তুলেছে। মইন-ফখরুদ্দীন আমলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উচ্চমূল্যে দিশেহারা জনগণ আওয়ামী লীগের ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ, বিনে পয়সায় সার প্রদান, ইত্যকার অবাস্তব প্রতিশ্রুতিতে বিভ্রান্ত হয়ে দলবেঁধে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য-পণ্যের মূল্য হ্রাস এবং ২০০৮ ও ২০০৯ সালে উপর্যুপরি দেশে ফসল ভালো হওয়ায় মহাজোটের ক্ষমতা লাভের প্রাথমিক পর্যায়ে দেশীয় বাজারে পণ্যমূল্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে থাকায় সরকারের অন্যান্য অপকর্মের দিকে জনগণ তখন পর্যন্ত তেমন একটা দৃষ্টিপাত করেনি। সরকারের প্রথম দু’বছরের অপশাসন, অপচয়, অদক্ষতা এবং দুর্নীতির ফলে দেশীয় কৃষিপণ্য উত্পাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাজেটে টান পড়তে শুরু করে। দেশের অর্থনীতি সঠিকভাবে পরিচালনায় সরকারের অমার্জনীয় ব্যর্থতার ফলে তৃতীয় বছরে গিয়ে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্ক অতিক্রম করলে বিশ্বের সব ফ্যাসিবাদী শাসকের মতোই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সর্বাত্মক নিপীড়নের পথ বেছে নেন, যা দিনে দিনে তীব্র হয়েছে।
শেয়ারবাজারে সরকার প্রধানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ লোকজন বাজার কারসাজির মাধ্যমে জনগণকে ১৯৯৬ সালের পর দ্বিতীয়বার সর্বস্বান্ত করায় জনমনে ক্ষোভের পরিমাণ প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে এলে তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের পরিবর্তে উপরের নির্দেশে পুলিশি অ্যাকশন আরম্ভ হয়েছে। পুলিশ রাস্তা থেকে বিক্ষোভকারীদের ধরে থানায় নিয়ে তাদের ওপর থার্ড ডিগ্রি নির্যাতন চালাচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে পুঁজি হারানো নাগরিকের আত্মহত্যার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটলেও অদ্যাবধি নীতিনির্ধারকরা নির্বিকার থাকছেন। তোফায়েল আহমেদের মতো মন্ত্রিত্ব না পাওয়া সরকারি দলের সিনিয়র সদস্যরা সংসদে মাঝেমধ্যে হইচই করলেও তাতে কাজের কাজ কিছু হয়নি। সরকার প্রধান এবং অন্যান্য মন্ত্রী চিহ্নিত লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কোনোরকম ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে এখানেও বিরোধী দলের ষড়যন্ত্রের গন্ধ শুঁকে বেড়াচ্ছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী নিজেও সর্বস্ব হারানো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে সূচকের আর পতন হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিন বছরে সার্বিক অর্থনীতিরও মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রতি বছর রেকর্ড সৃষ্টিকারী অতিকায় বাজেটের নামে দুর্নীতি ও অপচয়ের মহোত্সব চললেও দেশের কোথাও দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো উন্নয়নের চিহ্ন নেই। রফতানি প্রবৃদ্ধি আগের চেয়ে হ্রাস পেলেও আমদানির বছরওয়ারি বৃদ্ধি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ফলে, বাণিজ্য ঘাটতি আগের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। এদিকে, শেয়ারবাজারের লুণ্ঠিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির মাধ্যমে লব্ধ মুদ্রা পাচারের যুগল প্রতিক্রিয়ায় টাকার মানের অবমূল্যায়নেরও রেকর্ড গড়তে পেরেছেন অতিকথন প্রিয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাংলাদেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী সংগঠন মুজিববাদী দালাল গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় অর্থনীতি একেবারে বেহাল অবস্থায় না পৌঁছানো পর্যন্ত এতদিন ব্যবসায়ী নেতারাও ঠোঁট সেলাই করে নীরবতা পালন করেছেন। সম্ভবত জনরোষের ভয়ে অতি সম্প্রতি সরকারি দলের চিহ্নিত স্তাবক ব্যবসায়ীরা সেই সেলাই খুলতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ও সুশীল (?) সমাজের অধিকাংশ আওয়ামীপন্থী হওয়ায় তারাও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আগের সরকারগুলোর আমলের মতো সরব থাকেননি। চতুর্দিক থেকে এত সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থনীতির দুরবস্থার জন্য বিস্ময়করভাবে অর্থনীতিবিদ এবং গণমাধ্যমকে দোষারোপ করে কাঁধ থেকে দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করে নিজেকে জনগণের কাছে অধিকতর হাস্যস্পদ করে তুলেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ সরকার বিভিন্ন সময়ে হঠকারিতার কারণে এক সময়ের একচেটিয়া পশ্চিমা সমর্থন হারিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ অকাতরে বিসর্জনের বিনিময়ে ক্রমেই ভারতের কোলে আশ্রয় খুঁজেছে।
বাংলাদেশকে নিরাপত্তাহীন করে আমাদের মাতৃভূমিকে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবেশীর মৃগয়াক্ষেত্র বানানোর কাজটি বর্তমান সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নেয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। ২০০৯ সালের এই ফেব্রুয়ারি মাসেই বিডিআর বিদ্রোহের আবরণে একই সঙ্গে সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে ধ্বংস করে বাংলাদেশকে পুরোপুরি ভারতের আশ্রিত করে ফেলা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে যে কোনো রকম ঘটনাতেই প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তার জন্য আঞ্চলিক পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। ক’দিন আগে সেনাসদর আনুষ্ঠানিকভাবে এক রহস্যময় ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের সংবাদ গণমাধ্যমকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লির শাসকশ্রেণী যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেটি আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন যে কোনো বাংলাদেশী নাগরিকের জন্য চরম অবমাননাকর। প্রাথমিকভাবে সেই অভ্যুত্থানকে কথিত ‘ধর্মান্ধ’ গোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালনার অভিযোগ আনা হলেও এখন দেখা যাচ্ছে, সরকারঘনিষ্ঠ সামরিক ও বেসামরিক লোকজনই ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমান শাসকশ্রেণীর মধ্যে যে কোনো প্রকার আত্মসম্মানবোধ আর অবশিষ্ট যে নেই, সেটি সৈয়দ আশরাফ, দীপু মনি, গওহর রিজভী, মসিউর রহমানদের বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমেই দেশবাসী বুঝতে পেরেছেন। সীমান্তে আমাদের একজন নাগরিককে উলঙ্গ করে বিএসএফ কর্তৃক ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র দেখে সমগ্র দেশবাসী যখন শিউরে উঠেছে, বিদেশের মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলো নিন্দা প্রকাশ করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিচার পর্যন্ত দাবি করছে, তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ জানাচ্ছেন যে, তার সরকার এই কলঙ্কজনক ঘটনাতেও চিন্তিত নয়। সৈয়দ আশরাফ বিএসএফ-এর অব্যাহত হত্যাযজ্ঞকে তুচ্ছজ্ঞান করে উড়িয়ে দিয়েছেন।
বৃহত্তর সিলেটসহ সম্পূর্ণ মেঘনা বেসিনের জনপদের অধিবাসীরা টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠলেও আমাদেরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি সংসদে আধিপত্যবাদী ভারতের পক্ষ টেনে বলছেন, ওই বাঁধ নাকি আসামের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত হচ্ছে। এতদিন কিন্তু আমরা শুনে এসেছিলাম শুধু জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের উদ্দেশ্যেই ভারত বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় এই বৃহত্ বাঁধ নির্মাণের আয়োজন করেছে। এ দেশের সাধারণ মানুষের কথা হলো আসামের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যই হোক, কিংবা জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যেই হোক, বরাক নদীতে বাঁধ নির্মাণ হলে ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের নাগরিকরাই সর্বতোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু বাংলাদেশের অনিষ্ট হলে দীপু মনিদের তো কিছু যায়-আসে না। তারা তো আপাদমস্তক বন্ধক দিয়েই দিল্লির কাছ থেকে নিরাপত্তা লাভ করে বসে আছেন। দেশের জনগণ চূড়ান্তভাবে খেপে উঠলে প্রয়োজনে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সদস্যরা এই দালাল গোষ্ঠীকে নিরাপদ জায়গায় উড়িয়েও হয়তো নিয়ে যাবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলে ভিয়েতনামের বাছাই করা দালালদের মার্কিন দূতাবাসের ছাদ থেকে হেলিকপ্টারে উদ্ধার করার চিত্র স্মৃতিতে ভেসে উঠছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান দখলদার বাহিনী পরাজিত হলে ইয়াহিয়ার দালাল মন্ত্রীরা তত্কালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল অর্থাত্ আজকের রূপসী বাংলায় আশ্রয় নিয়েছিল। সৈয়দ আশরাফ, দীপু মনির মতো করেই আবুল মাল আবদুল মুহিত, গওহর রিজভী এবং মসিউর রহমান গং ভারতকে বিনা শুল্কে করিডোর দেয়ার অতি উত্সাহে সম্পূর্ণ জাতিকে অন্ধকারে রেখে তিতাস নদী ভরাট করে সেই নদীর বুকের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করে দিয়েছে। নিহত তিতাস নদী এবং তীরবর্তী মানুষের কান্না তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি। সর্ব প্রকার রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডের অপরাধে ইনশাআল্লাহ, একদিন এই পঞ্চম বাহিনীকে সদলবলে বিচারের জন্য আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
আমার ধারণা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের কর্তাব্যক্তিরা তাদের জনসমর্থন হারানোর বিষয়ে সম্যক অবহিত। এই মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তার ফলাফল কী হতে পারে, সে সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন যুগান্তর পত্রিকায় গত সপ্তাহেই ছাপা হয়েছে। সেই সংবাদে দাবি করা হয়েছে যে, পত্রিকা কর্তৃপক্ষের পরিচালিত জনমত জরিপ অনুযায়ী আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মাত্র ৬৯টি আসনে বিজয়ী হবে। পক্ষান্তরে বিএনপি একাই ১৭০টি আসনে জয়লাভ করবে। যুগান্তরের সম্পাদক মহাজোটের অংশীদার লে. জে. হু. মো. এরশাদের জাতীয় পার্টির মহিলা কোটার একজন সংসদ-সদস্য হওয়ায় পত্রিকাটিকে বিএনপিপন্থী বলার কোনো সুযোগ নেই। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাতেও যে ধস নেমেছে, সেটিও ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার তার নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন। মার্কিন সাময়িকী ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিপর্যয়ের বিষয়ে লিখতে গিয়ে নিবন্ধকার নীল চৌধুরী দেশে গণঅসন্তোষ বৃদ্ধির কথা বলেছেন। তিনি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে পৃথিবীর ‘সর্বনিকৃষ্ট’ আখ্যা দিয়েছেন। নীল চৌধুরীর প্রতিবেদন পাঠ করে আমার শেখ মুজিবুর রহমানের আমলের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ অপবাদের কথা মনে পড়ে গেল। তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ১৯৭৪ সালে ওই নামেই ডেকেছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় পিতা এবং কন্যার ‘দক্ষতার’ কী চমত্কার সাদৃশ্য!
লন্ডনের বিখ্যাত সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘দি ইকনোমিস্ট’ কয়েক মাস আগেই তিন কিস্তিতে বাংলাদেশে সুশাসনের চরম অভাবের কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ দেশের বিপর্যয়কর চিত্র এভাবেই একের পর এক উঠে আসার প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জনগণের তহবিলের লাখ লাখ পাউন্ড খরচ করে বিদেশের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে তাদের বায়বীয় সাফল্যের কথা প্রচারের ব্যর্থ চেষ্টা করছে। উপায়ান্তর খুঁজে না পেয়ে সরকারকে একই কুমিরছানা বারবার দেখানোর মতো করে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে তথাকথিত জঙ্গি তত্ত্ব ফেরি করার পাশাপাশি বাংলাদেশে সেনা অভ্যুত্থানবিষয়ক আষাঢ়ে গল্পও ফাঁদতে হচ্ছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে সেনা সদরকে ব্যবহার করার মতো আত্মঘাতী কৌশল অবলম্বন সত্ত্বেও দেশ-বিদেশে সরকারের পক্ষে তেমন একটা সমর্থন আদায় করা সম্ভব হয়নি। একমাত্র প্রত্যাশামত দিল্লি থেকে বাংলাদেশের জনগণ ও সেনাবাহিনীকে পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে যে, তারা সর্ব অবস্থায় বশংবদ শেখ হাসিনা সরকারের পাশেই থাকবে। তবে দেশের আশি শতাংশ জনগণ ফ্যাসিবাদী সরকারের জুলুম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ালে দিল্লির পক্ষে সেই জনজোয়ারের বিরুদ্ধে গিয়ে মহাজোট সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা কতখানি সম্ভব হবে, সেটি আমরা ভবিষ্যতেই দেখতে পাব।
মহানগর আওয়ামী লীগের ঢাকা দখলের ঘোষণা দেশে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে ভারতীয় সৈন্যদের আগ্রাসনের পটভূমি প্রস্তুতের কৌশল কীনা সে ব্যাপারেও স্বাধীনতাকামী জনগণকে অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে। গত মাসের ২৯ তারিখে বিএনপির পূর্বঘোষিত গণমিছিলের দিনে নগর আওয়ামী লীগ জনসভা ডেকে তাদের অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চরিত্রের প্রমাণ দিয়েছিল। ওই তারিখে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে পুলিশ গুলি চালিয়ে বিরোধী দলের পাঁচজন নাগরিককে হত্যা এবং ঢাকার গণমিছিল ঠেকাতে ১৪৪ ধারা জারি করলেও বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রনায়কোচিত আত্মসংযম বজায় রেখেছিলেন। গণমিছিল একদিন পিছিয়ে দিয়ে তিনি কেবল সহিষ্ণুতা ও বিজ্ঞতারই পরিচয় দেননি, রাজনীতির খেলাতেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছেন। সরকারের যাবতীয় উস্কানি উপেক্ষা করে আগামী ১২ মার্চ ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে পারলে তিনি পুনর্বার রাজনৈতিকভাবে বিজয়ী হবেন। ক্ষমতাসীন মহল মানসিকভাবে এর মধ্যেই পরাজিত হয়েছেন বলে ক্ষমতায় থেকেও নিজ দেশের রাজধানী দখলের উদ্ভট ঘোষণা দিয়ে তাদের ভীত-সন্ত্রস্ত চেহারাটি জনগণের কাছে দেখিয়ে ফেলেছেন। মহাজোট সরকার সম্ভবত উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, সর্বক্ষেত্রে পর্বতপ্রমাণ ব্যর্থতার কারণে তারা রাষ্ট্রশাসনের ন্যায্যতা সর্বতোভাবে হারিয়েছে। মেয়াদের বাকি সময়টা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ-কর্ম বাদ দিয়ে কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার নানা রকম কৌশল প্রণয়নে নীতিনির্ধারকদের ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে। সুতরাং, আইন প্রতিমন্ত্রী যতই হুঙ্কার ছাড়ুন না কেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে আওয়ামী মাঠ কর্মীদের মাঠে খুঁজে না পাওয়ার সম্ভাবনাই অধিক দেখতে পাচ্ছি। জানুয়ারির ৩০ তারিখে প্রশাসনের যাবতীয় বাধা উপেক্ষা করে বিএনপির গণমিছিলে জনজোয়ার সৃষ্টির বিপরীতে নগর আওয়ামী লীগের সভার দৈন্যদশা দেশের সব গণমাধ্যমে প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। সুতরাং, বিরোধ ও সহিংসতা এড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের উপায় খুঁজে বের করার জন্য সরকারপক্ষের বিরোধী দলের সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলোচনায় বসলে কেবল দেশটাই বাঁচবে না, আপনারাও হয়তো রক্ষা পাবেন।
ইমেইল : admahmudrahman@gmail.com

মন্তব্য প্রতিবেদন : বাংলাদেশে আক্রান্ত ইসলাম



মাহমুদুর রহমান
ক’দিন আগে অন্য একটি পত্রিকায় কর্মরত এক সিনিয়র রিপোর্টারের কাছ থেকে বাংলাদেশে ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়ায় প্রচারণার এক বিস্ময়কর গল্প শুনেছি। একদিন পত্রিকাটির সম্পাদকমণ্ডলীর একজন নীতিনির্ধারক সেই রিপোর্টারকে ডেকে এদেশে ‘ইসলামী জঙ্গিবাদের’ পুনরুত্থানের ওপর জরুরি ভিত্তিতে একটা স্টোরি লিখতে নির্দেশ দিলেন। সাংবাদিকটি দেশের কোন জায়গায় নতুন করে এই জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে, সেই তথ্য জানতে চাইলে সম্পাদক মহোদয় অগ্নিশর্মা হয়ে তাকে বললেন, জঙ্গি আছে কী নেই সেটা বিষয় নয়, স্টোরি লিখতে বলেছি, লিখে আনেন। বেচারা সিনিয়র রিপোর্টার বুঝতে পারলেন পেশাদার, ‘স্বাধীন’ সম্পাদক মহাশয় মালিকের নির্দেশ পালন করছেন মাত্র। পত্রিকার মালিকও হয়তো সরকারের ওপর মহল কর্তৃক বিশেষ উদ্দেশ্যে এ ধরনের প্রচারণা চালানোর জন্য নির্দেশিত হয়েছেন।
আমার পত্রিকা অফিসে বসে সেই সিনিয়র রিপোর্টার যেদিন এই ঘটনাটি বলছিলেন, তার আগের দিনেই চরম মুসলমানবিদ্বেষী এক মৌলবাদী খ্রিস্টান যুবক নরওয়ের রাজধানী অসলোতে গুলি চালিয়ে এবং বোমা ফাটিয়ে প্রায় একশ’ স্বদেশীকে হত্যা করেছে। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সে নাকি ইউরোপকে মুসলিম অধিগ্রহণ থেকে রক্ষা করার ‘মহান’ উদ্দেশ্যেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এই সন্ত্রাসী কাণ্ডের পর ‘সব মুসলমান সন্ত্রাসী নয়, তবে সব সন্ত্রাসী মুসলমান’, ভারত ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এবং আমাদের সুশীল (?)দের একাংশের এই প্রিয় তত্ত্বের কী হাল হবে, সেটি তারাই বিবেচনা করুক।
ইউরোপে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা সম্পর্কে ইউরোপোল-২০০৯ প্রতিবেদন এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬-২০০৮ সময়কালে ইউরোপে যতগুলো সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ০.৪ শতাংশ মুসলিম উগ্রবাদী কর্তৃক পরিচালিত হয়। ২০০৬ সালে ৪৯৮টি ঘটনার মধ্যে মাত্র একটিতে, ২০০৭ সালে ৫৮৩টি ঘটনার মধ্যে ৪টিতে এবং ২০০৮ সালে ৫১৫টির মধ্যে শূন্যটিতে ইসলামিস্টরা জড়িত ছিল। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৯৯.৬ শতাংশ সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য অমুসলিমরাই দায়ী।
আমার আজকের লেখার মূল বিষয়বস্তু বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিধায় পাশ্চাত্য নিয়ে কথা আর না বাড়িয়ে স্বদেশের দিকে দৃষ্টিপাত করছি। বর্তমান সেক্যুলার সরকারের আড়াই বছরে বাংলাদেশে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর লক্ষ্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চরম নিন্দনীয় যে কাজ-কর্মগুলো করা হয়েছে, তার মধ্য থেকে কয়েকটির দিকে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করছি।
১. ২০০৯ সালের ২৮ মার্চ ‘সন্ত্রাস নিরসনে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল বলেছেন, পৃথিবীতে যত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রয়েছে, তার সবই ইসলাম ও মুসলমানদের মধ্যে (!)। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কোনো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নেই। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়।
২. ২০০৯ সালের ১ এপ্রিল এদেশের আওয়ামীপন্থী শিল্পপতিদের অর্থে পরিচালিত সুশীল (?) থিংক ট্যাংক বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট আয়োজিত ওয়ার্কশপে বক্তৃতায় বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছিলেন, কওমি মাদরাসাগুলো এখন জঙ্গিদের প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কওমি মাদরাসাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করেছে। এসব কওমি মাদরাসায় যে শিক্ষা দেয়া হয়, তা কূপমণ্ডূকতার সৃষ্টি করছে। ’৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন সংশোধনী এনে ’৭২-এর সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে নস্যাত্ করার ফলেই এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার পর ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে।
৩. ২০০৯ সালের ২৩ এপ্রিল বরিশালের নিউ সার্কুলার রোডের এক বাড়িতে র্যাব হানা দিয়ে বোরকা পরে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য জড়ো হওয়ার অপরাধে ২১ নারীকে গ্রেফতার করে। র্যাব সাংবাদিকদের কাছে তাদের অভিযানের সংবাদ জানালে তা ফলাও করে ছাপা হয়। দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য না পেয়ে ২১ পরহেজগার নারীকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দেয়া হয়। ঘটনার দীর্ঘ ২ মাস পর ২৩ জুন আদালত তাদের বেকসুর খালাস দেন।
৪. ২০০৯ সালের ১৯ জুন রাজশাহীতে জঙ্গি সন্দেহে ১৫ নারী ও শিশুকে গ্রেফতার করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওইদিন বিকালেই মুচলেকা দিয়ে তাদের মুক্ত ঘোষণার পর আবার ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পুলিশ গ্রেফতারকৃতদের সম্পর্কে ব্যাপক তদন্ত করেও জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য পায়নি। শেষ পর্যন্ত আদালত তাদের বেকসুর খালাস দিলে জুলাই মাসের ১ তারিখে ১১ দিন কারাবাস শেষে ১৫ জন নিরপরাধ নাগরিক মুক্তি পান।
৫. বোরকা পরার অপরাধে ২০০৯ সালের ৩ জুলাই পিরোজপুর জেলার জিয়ানগরে ছাত্রলীগের বখাটে কর্মীদের প্ররোচনায় পুলিশ জঙ্গি সন্দেহে তিন তরুণীকে গ্রেফতার করে। তারপর পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে তিন তরুণীকে ঢাকায় টিএফআই সেলে নিয়ে আসা হয়। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারকৃত তরুণীদের বিরুদ্ধে মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন অমর সিংহ। এ সময় তাদের বোরকা খুলতে বাধ্য করে মহাজোট সরকারের দিনবদলের পুলিশ। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদেও কোনো জঙ্গি সংযোগের কাহিনী বানাতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফাইনাল রিপোর্ট দিতে বাধ্য হয়। দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দি থেকে অবশেষে তিন অসহায়, নিরপরাধ তরুণী মুক্তি পান।
৬. ২০১০ সালের ৩ এপ্রিল সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয় যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. একেএম শফিউল ইসলাম তার ক্লাসে ছাত্রীদের বোরকা পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তিনি ক্লাসে ‘মধ্যযুগীয় পোশাক বোরকা’ পরা যাবে না এবং এটি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের কোনো পোশাক হতে পারে না বলে ফতোয়া জারি করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটি বিভাগীয় কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তবে আমার ক্লাসে কোনো ছাত্রীকে আমি বোরকা পরতে দেব না।
৭. ২০১০ সালের ১ আগস্ট বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট পরিচয়দানকারী জনৈক দেবনারায়ণ মহেশ্বর পবিত্র কোরআন শরিফের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। রিট আবেদনে তিনি দাবি করেন, হজরত ইবরাহিম (আ.) তার বড় ছেলে ইসমাইল (আ.)কে কোরবানির জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন বলে যে আয়াত পবিত্র কোরআন শরিফে রয়েছে, তা সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, হজরত ইবরাহিম তার ছোট ছেলে হজরত ইসহাক (আ.)কে কোরবানি করতে নিয়ে যান। এ বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা ও কোরআনের আয়াত শুদ্ধ করার জন্য দেবনারায়ণ মহেশ্বর আদালতের কাছে প্রার্থনা করেন। আদালত রিট খারিজ করে দেয়ার পর দেবনারায়ণের এই চরম হঠকারী ও উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডে আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে পুলিশ দেবনারায়ণ মহেশ্বরকে কর্ডন সহকারে এজলাস থেকে বের করে তাদের ভ্যানে প্রটেকশন দিয়ে আদালত এলাকার বাইরে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যায়।
৮. বিচারপতি এইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের দ্বৈত বেঞ্চ ২০১০ সালের ২২ আগস্ট স্বপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) আদেশ প্রদান করেন যে, দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে বোরকা পরতে বাধ্য করা যাবে না। ‘নাটোরের সরকারী রাণী ভবানী মহিলা কলেজে বোরকা না পরলে আসতে মানা’ শিরোনামে ২২ আগস্ট একটি দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের বিচারপতিদ্বয় বোরকা পরিধানের বিরুদ্ধে সুয়োমোটো এই রায় দেন।
৯. ২০১১ সালের ২ জুন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের অন্যতম নেতা মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউল্লাহ দাবি করেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, বিসমিল্লাহ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি—এ তিনটির বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ওইদিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের মতবিনিময় সভা থেকে ঘোষণা করা হয় যে, সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম থাকলে হরতাল দেয়া হবে।
১০. ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী গ্রহণ করে আমাদের সংবিধানের মূল নীতি থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিস্থাপন করা হয়।
১১. ২০১১ সালের ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতৃভূমি টুঙ্গিপাড়া উপজেলার জিটি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক শঙ্কর বিশ্বাস দশম শ্রেণীর ক্লাসে দাড়ি রাখা নিয়ে সমালোচনাকালে হজরত মোহাম্মদ (সা.)কে ছাগলের সঙ্গে তুলনা করেন। এতে ওই ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে পুরো এলাকায় সাধারণ জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে শঙ্কর বিশ্বাস টুঙ্গিপাড়া থেকে পালিয়ে যান।
১২. ২০১১ সালের ২৬ জুলাই ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক মদন মোহন দাস মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এবং পবিত্র হজ নিয়ে কটূক্তি করেন। সহকর্মী শিক্ষকদের সঙ্গে এক সভায় তিনি মন্তব্য করেন, ‘এক লোক সুন্দরী মহিলা দেখলেই বিয়ে করে। এভাবে বিয়ে করতে করতে ১৫/১৬টি বিয়ে করে। মুহাম্মদও ১৫/১৬টি বিয়ে করেছে। তাহলে মুসলমানদের মুহাম্মদের হজ করা স্থান মক্কায় গিয়ে হজ না করে ওই ১৫/১৬টি বিয়ে করা লোকের বাড়িতে গিয়ে হজ করলেই তো হয়।’
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ৮৫ শতাংশ যে জন্মসূত্রে মুসলমান এ নিয়ে সম্ভবত বিতর্ক নেই। সেই দেশে আড়াই বছর ধরে অব্যাহতভাবে ইসলাম, কোরআন, হাদিস এবং মহানবী (সা.)কে কটাক্ষ করার অভ্যাস চর্চার ফলে ইসলামবিদ্বেষ এখন সরকারের সর্বত্র প্রায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে এবং এই ব্যাধির ভাইরাস ক্ষমতাসীন মহলের সব পর্যায়ের লোকজন অকাতরে বিতরণ করে চলেছেন। ইউরোপে অসুস্থ ইসলামবিদ্বেষ সর্বব্যাপী হয়ে ওঠার বিষক্রিয়াতেই নরওয়েতে অ্যানডার্স বেরিং ব্রেইভিক (Anders Behring Breivik) নামক খ্রিস্টান মৌলবাদী ঘাতকের উত্থান ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে ইসলাম, মুসলমান এবং আমাদের মহানবী (সা.)কে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চর্চা চলছে। ডেনমার্কে হজরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে সাম্প্রদায়িক কার্টুন ছাপা এবং বাকপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে পাশ্চাত্যের জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের এই অতীব নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডকে সমর্থনের ফলে জন্মলাভ করা বিষবৃক্ষের স্বাদ তারাই আজ আস্বাদন করছে।
নরওয়ের সুবুদ্ধিপূর্ণ রাজনীতিবিদরা অবশেষে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, এই ঘৃণ্য মানসিকতার আশু চিকিত্সা করা না হলে পশ্চিমের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যযুগের ইউরোপে এ-জাতীয় অন্ধ ধর্মীয় ঘৃণা ও বিদ্বেষ বিকশিত হওয়ার ফলেই তখন সেখানে যাজকদের নির্দেশে ডাইনি আখ্যা দিয়ে নারীদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপের দেশে দেশে চরমপন্থী খ্রিস্টানদের হাতে ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা নিগৃহীত, অত্যাচারিত হয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির মতো করেই আজ পূর্ব ইউরোপে ইহুদি বিদ্বেষ এবং পশ্চিম ইউরোপে ইসলামবিদ্বেষ দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। অসলো হত্যাকাণ্ডের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইসলামবিদ্বেষী পশ্চিমা মিডিয়া কর্তৃক এর দায়ভার কথিত ইসলামী জঙ্গির ঘাড়ে চাপানোর দুর্ভাগ্যজনক অপচেষ্টাও আমরা লক্ষ্য করেছি। ১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা সিটিতে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় শত শত মার্কিন নাগরিক নিহত হলে সেখানেও প্রাথমিকভাবে মৌলবাদী মুসলমানদের দায়ী করা হয়েছিল। তার ক’দিনের মধ্যেই প্রকৃত ঘাতক মৌলবাদী খ্রিস্টান টিমোথি ম্যাকভেই (Timothy McVeigh)-এর নাম বিশ্ববাসী জেনে ফেলে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত সুশীল (?) বাংলা দৈনিকে মহানবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবিকে কটাক্ষ করে ইউরোপের অনুরূপ ছড়া এবং কার্টুন ছাপা হলে দেশে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জেনারেল মইনের তত্কালীন জরুরি সরকারের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব উবায়দুল হকের কাছে উপস্থিত হয়ে পত্রিকাটির প্রখ্যাত ‘সেক্যুলার’ সম্পাদকের জোড় হস্তে ক্ষমাপ্রার্থনার ফলে সেই সময় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ক্ষোভ খানিকটা প্রশমিত করা সম্ভব হয়েছিল। বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীদের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত নরওয়ের ব্রেইভিকের সমতুল্য ইসলামবিদ্বেষ সময়-সুযোগমত জনসমক্ষে প্রকাশ পায়। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা প্রচার করলেও অন্তরে এদের অধিকাংশই চরমভাবে সাম্প্রদায়িক। এদের সাম্প্রদায়িকতা অবশ্য মূলত ইসলাম ধর্মবিরোধী। ইসলাম ছাড়া অন্য সব ধর্মমতের প্রতিই তাদের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের দাবি অনুযায়ী ডিজিএফআই’র কারসাজিতে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশে চিহ্নিত ইসলামবিরোধী গোষ্ঠীর এদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ধর্মের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত আক্রমণ চালানোর সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়। গত আড়াই বছরে ইসলাম ধর্মের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর প্রাথমিক কিছু নমুনা আমরা দেখতে পেয়েছি।
বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিক যে বর্তমান সরকারের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে, সেটি সম্ভবত নীতিনির্ধারকদের অজানা নয়। গত এক বছরের স্থানীয় সরকার পর্যায়ের সবক’টি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে যে কোনো নিরপেক্ষ বিশ্লেষক নিশ্চিতভাবেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, মহাজোট সরকারের পায়ের তলায় আর মাটি নেই। জনসমর্থনহীন শাসকশ্রেণী যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য স্বাভাবিকভাবেই ক্রমেই অতিমাত্রায় বিদেশনির্ভর হয়ে পড়ছে। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে ভারতের সব অন্যায্য চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবেশীর একমাত্র বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মিত্রে পরিণত হতে পেরেছেন। সুতরাং ধরে নেয়া যেতে পারে যে, ভারতীয় শাসককুল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আসীন রাখার জন্য যথাসম্ভব প্রচেষ্টা চালাবে।
লন্ডনের ‘ইকোনমিস্টে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও ভারত মহাজোটকে টাকার থলি এবং এন্তার পরামর্শ দিয়ে নির্বাচনে জিততে সহায়তা করেছিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় একমাত্র ভারতের সহযোগিতায় বাংলাদেশের জনমতের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় টিকে থাকা যে সম্ভব নয়, সেটা শেখ হাসিনার মতো ঝানু রাজনীতিবিদ অবশ্যই বোঝেন। ২০০৮-এর পরিস্থিতির মতো ভারতের সমর্থনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন যুক্ত হলে দেশের জনগণকে তখন মহাজোটের আর তোয়াক্কা না করলেও চলবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অব্যাহত ইসলামবিরোধিতা সম্ভবত সেই সমর্থন আদায়েরই কৌশল।
বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছিল শেখ হাসিনারই আগের শাসনামলে। সেই দুর্ভাগ্যজনক ও চরম নিন্দনীয় জঙ্গিবাদও মাথাচাড়া দিয়েছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেই। আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েট দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে কিছু বাংলাদেশী নাগরিকও যোগদান করেছিল। তারাই এদেশে মূলত জঙ্গিবাদের বীজ বহন করে নিয়ে এসেছে। এখানে উল্লেখ্য, সে সময় আফগানিস্তানের রণাঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রগুলো তাদের আদর্শগত সোভিয়েটবিরোধিতার কারণে মুজাহিদদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। ফলে আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য ইসলামিক রাষ্ট্র থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা আফগানিস্তানে সোভিয়েট দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গেলে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব তাতে সায় দিয়েছিল। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনে বিজয় লাভের ঠিক আগে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলা বিশ্বরাজনীতির হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। বিশ্বব্যাপী জোরেশোরে কথিত ইসলামী জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণা শুরু হলে বাংলাদেশও তার প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেনি। কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে বাংলাদেশে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলাভাইয়ের রাষ্ট্র ও ধর্মবিরোধী জঙ্গি কর্মকাণ্ড এবং তাদের উত্থানের প্রাথমিক পর্যায়ে তত্কালীন সরকারের মধ্যকার এক ধরনের নির্লিপ্ততা পশ্চিমের সঙ্গে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের দূরত্ব সৃষ্টি করে। শেষপর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেই উভয় জঙ্গি নেতার গ্রেফতার ও তাদের বিচার সম্পন্ন হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারকরা তাতেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। যে কোনো বিচক্ষণ রাজনীতিবিদের মতোই শেখ হাসিনা প্রতিপক্ষের এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে প্রেসিডেন্ট বুশের কথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (war against terror)'র সঙ্গে প্রকাশ্যে একাত্মতা ঘোষণা করেন। সেই থেকে মার্কিন সমর্থন ধরে রাখার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা তার ইসলামী জঙ্গি কার্ড অবিরাম খেলে চলেছেন। ফলে বাংলাদেশ আজ এমন একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইসলামবিরোধী নগ্ন প্রচারণা কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। যে সংবাদপত্রের ঘটনা দিয়ে আজকের মন্তব্য-প্রতিবেদন শুরু করেছি, তারাও সরকারের হুকুম তামিল করে চলেছেন মাত্র। উত্তরার র্যাব-১ হেডকোয়ার্টারে অবস্থিত টিএফআই সেলে রিমান্ডে থাকা অবস্থায় আমি নিজ চোখে শ্মশ্রুমণ্ডিত তরুণ এবং মধ্যবয়সীদের সেখানে আটক দেখতে পেয়েছি। তাদের গোঙানির শব্দ থেকে নির্যাতনের মাত্রাটাও খানিক আন্দাজ করতে পেরেছি। ক’দিন পরপর টেলিভিশনের পর্দায় ইসলামী জঙ্গি নাম দিয়ে যাদের আটক দেখানো হয়, তাদেরও হয়তো উপরের নির্দেশে প্রয়োজনমাফিক টিএফআই সেল মার্কা নির্যাতনকেন্দ্রগুলো থেকেই সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গি দমনে তার অপরিহার্যতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ইউনূসকে সরকার চরমভাবে অপমানিত করায় সরকারের সঙ্গে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে, নিয়মিতভাবে জঙ্গিনাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকরা সেই দূরত্ব কমানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। তাদের মূল লক্ষ্য সম্ভাব্য গৃহপালিত বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদকে সঙ্গে নিয়ে আগামী ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচনের আন্তর্জাতিক বৈধতা লাভ। ২০০৮ সালে নির্বাচনের মাত্র মাসখানেক আগে দেশে ফেরার সময় শেখ হাসিনা ওয়াশিংটনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তত্কালীন বুশ প্রশাসনকে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে নির্বাচনে ফায়দা লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। বাংলাদেশে আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। সেই নির্বাচনে যিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হোন না কেন, এখানে শেখ হাসিনা তার গতবারের সফল ইসলামী জঙ্গি কার্ডই যে ব্যবহার করবেন, সেটা নিশ্চিত।
সাম্য ও শান্তির ধর্ম ইসলামে জঙ্গিবাদ যে সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য, এ নিয়ে ইসলামের প্রকৃত আদর্শে বিশ্বাসীদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই বলেই আমার ধারণা। কিন্তু একই সঙ্গে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোও একজন ঈমানদার মুসলমানের কর্তব্য। বাংলাদেশে কল্পিত ইসলামী জঙ্গিতত্ত্ব বিদেশে ফেরি করে যারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের ঐক্যবদ্ধ হয়েই মিথ্যা প্রচারণার জবাব দিতে হবে। ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতায় বিমোহিত হয়ে যারা আমাদের সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থা সরিয়ে ফেলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন, তাদের নরেন্দ্র মোদীর গুজরাটের দিকে দৃষ্টিপাত করতে অনুরোধ জানাই। বাংলাদেশে আড়াই বছর ধরে যা ঘটে চলেছে, তার উল্টোটি গুজরাটে ঘটলে সেখানে অসহায় সংখ্যালঘুদের ভাগ্যে কী হতো, তার নমুনা ২০০২ সালে দেখা গেছে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা থাকলেই যে জনগণ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী হয় না, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ প্রতিবেশী ভারত। অপরদিকে সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস লিপিবদ্ধ থাকলেই যে দেশের নাগরিকরা সাম্প্রদায়িক হয়ে পড়েন না, তার উজ্জ্বল উদাহরণ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিলে-মিশে থাকা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ঐতিহ্য। আশা করি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ঘৃণ্য কৌশল হিসেবে ক্ষমতাসীনরা ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণে ইসলামবিরোধী সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবেন না।
ইমেইল : admahmudrahman@gmail.com

মন্তব্য প্রতিবেদন : ওরা মানুষ নয় ওরা শিবির


মাহমুদুর রহমান
16-02-2010 আমার দেশ
ইতিহাসে পড়েছি প্রাচীন ভারতে রাজন্যবর্গ অমাত্য, সৈন্যসামন্ত সমভিব্যহারে বন্যপ্রাণী শিকারে বের হতেন। সৈন্যসামন্তের কাজ ছিল দল বেঁধে শিকারটিকে তাড়িয়ে রাজার সামনে এনে দেয়া। রাজামশাই তারপর সেই শ্রান্ত-ক্লান্ত প্রাণীটিকে বধ করে তার অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করতেন। অপ্রয়োজনে বন্যপ্রাণী হত্যার মতো নিষ্ঠুর কাজে ব্যাপৃত থাকলেও তাদের রোমান্টিক মন আবার সুন্দরী রমণীদের খোঁজেও থাকত। বন-জঙ্গলে লালিত ঋষিকন্যার রাজার মন জয় করার চিত্তাকর্ষক কাহিনী অনেক পাঠকেরই জানা। গত ক’দিন ধরে বাংলাদেশে শিবিরকর্মী ধরতে যে তথাকথিত চিরুনি অভিযান চলছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই পুরাকালে রাজ-রাজড়াদের আনন্দ-মৃগয়ার গল্প মনে পড়ল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তার আদেশ শিরোধার্য করেই দেশের তাবত্ পুলিশকে দলীয় ঠ্যাঙারে বাহিনীর মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার লক্ষ্যে চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, শিবির ধরা অভিযানে ছাত্রলীগ কর্মীরা পুলিশকে সহায়তা করছে। পুলিশ এবং ছাত্রলীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই যৌথ অভিযান সংবিধানের কোন ধারা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে, তার জবাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীই ভালো দিতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী মহোদয় দেশ থেকে জামায়াত-শিবির একেবারে উত্খাতের ঘোষণা দিয়েছেন। এসব নির্দেশ এবং ঘোষণা যে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, ‘স্বাধীন আদালতের’ যুগে সরকার তার পরোয়া করার কোনো প্রয়োজন বোধ করছে না। সংবিধানের আলোচনার আগে সরকারপন্থী মিডিয়ার ভূমিকা পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। শিবিরের বিরুদ্ধে পুলিশ-ছাত্রলীগের যৌথ অভিযান সম্পর্কে দুটি চিহ্নিত সংবাদপত্রের একই দিনের শিরোনাম যথাক্রমে—‘শিবির পালাচ্ছে’ এবং ‘শিবিরের তাণ্ডব’। বাংলাদেশের একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে পত্রিকা দুটির শিরোনাম পড়ে আমি যারপরনাই বিভ্রান্ত হয়েছি। যে পালায় সে-ই আবার তাণ্ডব চালায় কী করে—এই ধাঁধার উত্তর আমার জানা নেই। অপসাংবাদিকতার একটা সীমা থাকা দরকার। উভয় পত্রিকাই সরকারের মুখপত্র হওয়ার প্রতিযোগিতায় রত এবং সম্পাদকদ্বয় মাস কয়েক আগেই দিল্লি সফর করে এসেছেন। যতদূর জানি, একটি পত্রিকার মালিকের ব্যাংকে বিপুল অংকের খেলাপি ঋণ সমস্যা রয়েছে এবং অন্য মালিক ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র প্রেসিডেন্ট পদটি পেতে আগ্রহী।
ক’দিন আগে টেলিভিশনের টকশো’তে বাংলাদেশের অপর এক প্রখ্যাত সম্পাদকের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মন্তব্য শুনে বিস্মিত হয়েছি। ভদ্রলোকের রাজনৈতিক আদর্শ যাই হোক না কেন, তাকে এতদিন মানবাধিকারের পক্ষশক্তি হিসেবেই বিবেচনা করতাম। তিনি বললেন, শিবিরের মানসিকতায় ঐতিহ্যগতভাবে যে মধ্যযুগীয় বর্বরতা রয়েছে তারই বহিঃপ্রকাশ নাকি ঘটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির কর্তৃক ছাত্রলীগ কর্মী হত্যার মধ্য দিয়ে। তিনি সম্ভবত হতভাগ্য ছাত্রটিকে কেবল হত্যা করেই ক্ষান্ত না হয়ে তার মৃতদেহ ম্যানহোলে ফেলে দেয়ার নির্মমতা লক্ষ্য করেই মন্তব্যটি করেছেন। কিন্তু, আমার বিবেচনায় সব হত্যাকাণ্ডই বর্বরতা। শিবির কাউকে হত্যা করলে সেই ঘটনাকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলব, আর ছাত্রলীগ অথবা ছাত্রদল একই নির্মমতা প্রদর্শন করলে সেটি ডিজিটাল অথবা আধুনিক হত্যাকাণ্ড হয়ে যাবে—এমন সরলীকরণের পক্ষে যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। রাজশাহীর একজন ছাত্রের হত্যাকাণ্ডকে যদি আমরা মধ্যযুগীয় বর্বরতা আখ্যা দেই, তাহলে ২৮ অক্টোবর দিনে-দুপুরে টেলিভিশন ক্যামেরা এবং শত শত পুলিশের সামনে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে তাদের মৃতদেহের ওপর উল্লসিত আওয়ামী লীগ কর্মীদের লাফালাফিকে সম্পাদক মহোদয় কী বিশেষণ দেবেন তা আমার জানা নেই। অথবা ইঙ্গ-মার্কিন জল্লাদ বাহিনী প্রায় এক দশক ধরে ইরাক এবং আফগানিস্তানে যে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, তাকে আমরা কী বলব? ইসরাইলি সামরিক বাহিনী প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীকে যে প্রক্রিয়ায় বিগত ষাট বছর ধরে হত্যা করছে, তাকেই বা কোন বিশেষণে অভিহিত করা হবে? ভারতীয় বাহিনী আমাদের সীমান্তে বছরের পর বছর ধরে যেভাবে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করে চলেছে, তাকে মধ্যযুগীয় বলব নাকি আধুনিক পদ্ধতিতে গুলি করে অথবা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা অভিহিত করে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাজনিত কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করব? ফ্যাসিবাদ নিয়ে যতটুকু পড়াশোনা করেছি তাতে জনপ্রিয় সম্পাদকের সেদিনের বক্তব্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি ফ্যাসিবাদেরই গন্ধ পেয়েছি। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানো এবং রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক তাদের ওপর নির্যাতনের পর সেটিকে বৈধতার প্রলেপ দেয়ার অপচেষ্টা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞাতেই পড়ে।
এবার বেচারা সংবিধানের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩৭ এবং ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদগুলো উদ্ধৃত করছি যাতে বর্তমান সরকারের সব মৌলিক অধিকার এবং দেশের প্রচলিত আইনবিরোধী কার্যকলাপের ভয়ঙ্কর চিত্রটি পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারেন :
“অনুচ্ছেদ-২৭ : আইনের দৃষ্টিতে সমতা।—সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
অনুচ্ছেদ-৩১ : আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার।—আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।
অনুচ্ছেদ-৩৭ : সমাবেশের স্বাধীনতা।—জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।
অনুচ্ছেদ-৩৮ : সংগঠনের স্বাধীনতা।—জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।”
বাংলাদেশ সরকার যেহেতু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার কোনো ঘোষণা দেয়নি, কাজেই উদ্ধৃত চারটি অনুচ্ছেদে প্রদত্ত অধিকার সংগঠনদ্বয়ের প্রতিটি নেতাকর্মী সংরক্ষণ করে। এই বাস্তবতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শিবির উত্খাতের ঘোষণা সংবিধান পরিপন্থী ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার জ্বলন্ত প্রমাণ। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই জাতীয় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ থাকলেও ‘স্বাধীন আদালতে’ ন্যায়বিচার কতটা পাওয়া যায় তার অতি সাম্প্রতিক বিরূপ অভিজ্ঞতা আমারই রয়েছে। সে সম্পর্কে গতকালের আমার দেশ পত্রিকায় একটি সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। সংবিধান, আইন ও আদালতের কোনো তোয়াক্কা বর্তমান সরকার যে করে না তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আরও একটি বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, ‘রাজশাহীতে আমাদের এক ভাইকে খুন করেছে। অনেকের হাত-পায়ের রগ কেটে দিয়েছে। শিবির সারাদেশে ছাত্রলীগের ভাইদের হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরকে আর ছাড় দেয়া হবে না। তাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ জার্মানির এডলফ্ হিটলার যখন সেদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলের জন্য কমিউনিস্টবিরোধী এবং ইহুদিদের বিরুদ্ধে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান (Ethnic Cleansing) চালিয়েছিলেন, ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের মুখে অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের মতোই ভাষা পাওয়া যাবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যে কোনো ছাত্রই রাইখস্ট্যাগের সাজানো নাটক সম্পর্কে পড়েছেন। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিটলারের আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত কিনা সেই তথ্য অবশ্য আমার অজানা। তবে, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কয়েকটি প্রশ্ন না করে পারা যাচ্ছে না। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যকার সব পুরুষ প্রজাতিকে আপনি যে ভাই হিসেবে বিবেচনা করেন সেটি অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। প্রশ্ন হলো, দলনিরপেক্ষ এবং বিরোধী মতের সবাইকে আপনি বৈমাত্রেয় ভাই বা বোন বিবেচনা করে তাদের প্রতি আজন্মলালিত কোনো আক্রোশ অনুভব করেন কি-না? নইলে দরিদ্র পরিবারের সন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবুবকর যখন আপনার ভাইদের আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধের বলি হয়, সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে আপনি উপহাস করেন কী করে? তখন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আপনার চিরুনি অভিযান কোথায় যায়? মন্ত্রীর শপথ গ্রহণ করার সময় আপনি নিশ্চয়ই উচ্চারণ করেছিলেন, ‘কোনো অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হইয়া আমি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিব না।’ রাজশাহী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই প্রকৃতির হত্যাকাণ্ডে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মাধ্যমে আপনি সেই শপথ ভঙ্গ করেছেন কি-না? সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে সব নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে যে সমান ঘোষণা করা হয়েছে, সংবিধানের সেই নির্দেশনা আপনি মান্য করেন কি-না?
বাংলাদেশে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বাকশাল আমল ছাড়া সর্বকালের সীমা অতিক্রম করলেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধ্বজাধারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং এদেশীয় দালালশ্রেণী কেবল নীরবতাই অবলম্বন করছে না , উপরন্তু, তাদের মুখপত্রগুলো এই অন্যায় আচরণকে বৈধতা দেয়ার নির্লজ্জ চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে পুরনো আহমদিয়া ইস্যুর কথা মনে পড়ে গেল। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে একদল অতি বিপ্লবী ইসলামপন্থীর আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে কিছুদিন পরপরই বেশ বড় বড় জঙ্গি বিক্ষোভ মিছিল বের করে ওদের উপাসনালয়ে আক্রমণের চেষ্টা চালাত। চারদলীয় জোটের পুরোটা সময় ধরেই এই আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড চালালেও বিগত সাড়ে তিন বছর তারা এক প্রকার পর্দার অন্তরালেই অবস্থান করছে। সেই সময় কে তাদের অর্থায়ন এবং পৃষ্ঠপোষকতা করত, সেই রহস্যের আজও কিনারা হয়নি। যাই হোক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এই আহমদিয়া ইস্যুটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল এবং সেই সময় সরকারের সঙ্গে মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু সংক্রান্ত যে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনায় তারা অবধারিতভাবে আহমদিয়া প্রসঙ্গ উত্থাপন করত। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর কর্তাব্যক্তিদের বাংলাদেশ সফরের সময় আহমদিয়াদের উপাসনালয়ে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেয়াটা নির্দিষ্ট রুটিনে পরিণত হয়েছিল। আগেই উল্লেখ করেছি, এখন আর দেশে আহমদিয়াবিরোধী আন্দোলনের কোনো নাম-নিশানা নেই। তবে সরকার সম্প্রতি যে চণ্ডমূর্তি ধারণ করে জামায়াত-শিবিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, সেটি এদেশে এক নতুন অভিজ্ঞতা। দেশের অধিকাংশ সংবাদপত্র সরকারপন্থী হওয়ার সুযোগে মানবাধিকারকে পদদলিত করতে প্রশাসনের কোনো সমস্যাই পোহাতে হচ্ছে না। যে একটি-দুটি পত্রিকা নিতান্তই ব্যতিক্রম হিসেবে এই দমননীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ক্ষমতাসীনদের নির্যাতন অথবা দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করার ঝুঁকি নিচ্ছে, তারাই রাষ্ট্রযন্ত্রের সব ধরনের দমন-পীড়নের শিকারে পরিণত হচ্ছে। ইঙ্গ-মার্কিন-ভারত-ইসরাইল কৌশলগত মৈত্রী যতদিন অব্যাহত থাকবে ততদিন বাংলাদেশের ভারতপন্থী সরকারের এসব অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কোনো প্রতিবাদ আসার সম্ভাবনা আমি অন্তত দেখি না। সেরকম কোনো আশঙ্কা থাকলে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (Bangladesh Development Forum) ঢাকা বৈঠকের সময় দেশকে এ ধরনের অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে নেয়ার ঝুঁকি কোনো অবস্থাতেই নিত না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এ জাতীয় আন্তর্জাতিক বৈঠকের প্রাক্কালে সরকার পারতপক্ষে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চায় না। সব বিবেচনাতেই আমরা এক ব্যতিক্রমধর্মী সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে পাচ্ছি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দিন যে সত্যিই বদল করতে পেরেছে, তাতে আর সন্দেহ কী?
জনগণের জন্য অধিকতর বিপদের কারণ হলো, প্রধান বিরোধী দলও অনেকটা আপস করেই কোনোক্রমে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করার কৌশল গ্রহণ করেছে। এতদিন সংসদ বর্জন করে বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকের ঠিক দিন কয়েক আগে সংসদে প্রত্যাবর্তনের আকস্মিক সিদ্ধান্ত কেন তারা গ্রহণ করলেন তা তারাই ভালো জানেন। তবে কেবল বিদেশিদের সন্তুষ্টি অর্জন অথবা তাদের সহানুভূতি কুড়ানোর জন্যই যদি বিনাশর্তে এই ছাড় দেয়া হয়ে থাকে তাহলে এর মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের রাজনৈতিক দীনতা, অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এবং জনগণের শক্তির ওপর আস্থাহীনতা প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি দলের শিষ্টাচারবহির্ভূত, অসংসদীয় আচরণ অব্যাহত রাখা দেখে দেশবাসী এটাও বুঝতে পেরেছে যে, ক্ষমতাসীনরা বিরোধী পক্ষকে শক্তিহীন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনা করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিদিন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদে যাচ্ছেন এবং তাদের জীবিত অথবা মৃত শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশে সরকারি দলের অবমাননাকর কুত্সা হজম করে ওয়াক আউট করছেন, পরের দিনের একই নাটকে অংশ নেয়ার জন্য। এর ফলে তারা যে জনগণের কাছে নিজেদের ক্রমেই হাসির পাত্র করে তুলছেন সে বিষয়টি নীতিনির্ধারকরা বোঝেন কিনা আমার জানা নেই। ক্ষমতাসীনদের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিবাদী প্রবণতা জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এবং রাজপথের আন্দোলন ছাড়া যে রোখা যাবে না, এই সহজ সত্যটি বিরুদ্ধ মতাবলম্বীরা যত দ্রুত উপলব্ধি করবেন ততই দেশের মঙ্গল। পৃথিবীর ইতিহাসে যে কোনো আপসকামিতা বার বার ফ্যাসিবাদকেই উত্সাহিত করেছে। উটের মতো বালিতে মাথা গুঁজে আত্মরক্ষা কিংবা দেশরক্ষা শেষ পর্যন্ত কোনোটাই হবে না।

শুক্রবার, ৬ এপ্রিল, ২০১২

মন্তব্য প্রতিবেদন : স্বাধীন বিচারের নামে তামাশা


মাহমুদুর রহমানঃ ১০-০৫-২০১০
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে এই রাজধানীতে প্রায় প্রতিদিন অন্তত একটি করে সেমিনারের আয়োজন করা হতো। তত্কালীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে উদগ্রীব স্বার্থান্বেষী বিদেশি মহলের অর্থায়নে এ দেশের চিহ্নিত পরজীবী শ্রেণী সেসব সেমিনার আয়োজনের দায়িত্বে থাকত। সুশাসন নামটি ফেরি করার সুবিধার্থে নতুন নতুন সংগঠনও গজিয়ে উঠেছিল সুশীল(?) সমাজের চাঁইদের সমন্বয়ে। জেনারেল মইন ও তার শাসন ব্যবস্থার অনুসারী শেখ হাসিনার যৌথ শাসনের সাড়ে ৩ বছরে দেশে প্রকৃতপক্ষে জঙ্গলের আইন চললেও আইনের শাসনের দেশি-বিদেশি ধ্বজাধারীদের টিকিটিরও আর নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত তাদের বিবেচনায় শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশে আইনের শাসন ও সুশাসন উভয়ই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের জনগণ সংবিধানে প্রদত্ত সব অধিকার বিনা বাধায় ভোগ করতে পারছে। সুশীলদের(?) এ জাতীয় পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিবেচনাবোধ আমাদের মতো আমজনতার বুদ্ধির অগম্য হওয়ারই কথা। ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আমরা বুঝি, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্তই হচ্ছে রাজনৈতিক পক্ষপাতশূন্য, বিবেক দ্বারা তাড়িত বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিচার ব্যবস্থা। ২০০৭ সালের জানুয়ারির ১১ তারিখে জেনারেল মইনের ক্ষমতা দখলের পর থেকে এ দেশের বিচার বিভাগে যে পচনক্রিয়া শুরু হয়েছে শেখ হাসিনার আমলে তা দ্রুততর হয়ে এখন সেখান থেকে রীতিমত দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। এই মন্তব্যের মাধ্যমে আমি এ ধরনের কোনো অসার দাবি করতে চাচ্ছি না যে, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশের আদালতপাড়ায় কোনোই রাজনীতিচর্চা হতো না, কিংবা জায়গাটি একেবারে সুবিচারের পীঠস্থানে পরিণত হয়েছিল। তবে এটুকু বোধহয় সবাই মানবেন যে, মূল্যবোধের অবক্ষয় চলমান থাকলেও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তখন পর্যন্ত অন্তত খানিকটা চক্ষুলজ্জা অবশিষ্ট ছিল। কিংবা তারও আগে শেখ হাসিনার প্রথমবারের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় উচ্চ আদালতের মেরুদণ্ড এতটাই শক্ত ছিল যে, তারা তত্কালীন দুর্বিনীত প্রধানমন্ত্রীকে Wrong Headed (বিকৃত বুদ্ধি) অভিহিত করতেও কোনো ধরনের দ্বিধা করেননি। ভাবতে অবাক লাগে, বর্তমানের বিচারপতিরা উচ্চ আদালতের একই আসনে বসলেও পূর্বসূরিদের কাছ থেকে বিচারকের সাহস, নিরপেক্ষতা, সংবিধানের প্রতি আনুগত্যবোধ কিছুই শিখতে পারেননি। সমাজের নানা স্তরের অবক্ষয় মেনে নেয়া গেলেও বিচার বিভাগের অবক্ষয় বিনা প্রতিবাদে মুখ বুঝে সহ্য করা হলে এই রাষ্ট্রের বিনাশ অনিবার্য।
এক-এগারোর পর থেকে অব্যাহতভাবে বাংলাদেশে নজিরবিহীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বেশুমার ঘটনা ঘটে চলেছে। জেনারেল মইন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিচার বিভাগের নানা দুর্বলতাসৃষ্ট অসহায় আত্মসমর্পণের সুযোগ নিয়েই এই নিপীড়ন চালাতে পেরেছেন বা পারছেন। জরুরি সরকারের সময় গুটিকয়েক সাহসী ও বিবেকসম্পন্ন বিচারককে ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করলে তত্কালীন বিচার বিভাগ একটি অবৈধ ও জুলুমবাজ সরকারের সহায়তাকারীর ভূমিকায় নিঃসন্দেহে অবতীর্ণ হয়েছিল। নির্বাচিত সরকারের আমলে অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫-এ বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে নিম্নবর্ণিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে :
‘অনুচ্ছেদ-৩৫ : বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ।—
১) অপরাধের দায়যুক্ত কার্যসংঘটনকালে বলবত্ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবে না এবং অপরাধ-সংঘটনকালে বলবত্ সেই আইন বলে যে দণ্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাহাকে তাহার অধিক বা তাহা হইতে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাইবে না।
২) এক অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারিতে সোপর্দ ও দণ্ডিত করা যাইবে না।
৩) ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারলাভের অধিকারী হইবেন।
৪) কোন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাইবে না।
৫) কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।
৬) প্রচলিত আইনে নির্দিষ্ট কোন দণ্ড বা বিচারপদ্ধতি সম্পর্কিত কোন বিধানের প্রয়োগকে এই অনুচ্ছেদের(৩) বা (৫) দফার কোন কিছুই প্রভাবিত করিবে না। ’
বিগত সাড়ে ৩ বছরে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত উপরোক্ত ধারাটির প্রত্যেকটি নির্দেশনা জরুরি ও নির্বাচিত উভয় সরকারই নির্দ্বিধায় অমান্য করেছে। হাইকোর্টের একজন মাননীয় বিচারপতি বর্ণিত সোনার শিকলে বাঁধা স্বাধীন বিচার বিভাগ জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করার কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ তো দূরের কথা, নিজেরাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারকে নির্যাতনের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। বছরের পর বছর কোনো ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কেবল সরকারের বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে দুগ্ধপোষ্য শিশু, বালক, মহিলা নির্বিশেষে অসংখ্য ব্যক্তিকে বিনাবিচারে আটক রাখা হলেও উচ্চ আদালত চোখে কালো পট্টি বেঁধে যার যার আসন রক্ষা করতে ব্যস্ত। অত্যাচারিতদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করলেও চেম্বার নামক ফাটকে আবার বিশাল তালা মেরে দেয়া হচ্ছে। হাইকোর্টের বিচারিক অধিকার কেড়ে নেয়ার যে প্রক্রিয়া মইনের চেম্বার জজরা আরম্ভ করেছিলেন তা শুধু অব্যাহতই নেই, বর্তমানে হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিদের প্রদত্ত রায় নিয়ে অবমাননাকর ছেলেখেলা করা হচ্ছে। এই সংক্রান্ত একটি সংবাদ ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষের স্টে’ শিরোনামে ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার অপরাধে আমার বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আদালত অবমাননার মামলা করা হয়েছে। দেশের উচ্চতম আদালতে বিচারাধীন বিষয় সম্পর্কে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কোনো নাগরিক মন্তব্য করার অধিকার রাখেন না। আমারও সেই সুযোগ নেই। শুধু এটুকু আগাম বলে রাখছি, সত্য কথা প্রকাশের অপরাধে কারাগারে যেতে আমি বরং গৌরবই বোধ করব। কারাগার থেকে জীবিত ফিরে আসতে পারলে আবার সত্য কথা বলব এবং লিখব, প্রয়োজনে পুনর্বার কারাগারে যাব।
আপিল বিভাগের মাননীয় বিচারপতিদের আইনের নজির দেখানোর ধৃষ্টতা আমি রাখি না। তবে পাঠকের জ্ঞাতার্থে নাসরীন কাদের সিদ্দিকী বনাম রাষ্ট্রের একটি মামলায় আপিল বিভাগ প্রদত্ত রায়ের অংশবিশেষ এখানে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় উদ্ধৃত করতে চাচ্ছি,
‘‘A question of fact or mixed question of fact and law ought to be raised in the High Court Division for a proceeding under Article 102 of the Constitution. An appellant should not ordinarily be allowed to convert the Appellate Division into a court of first instance.
[Nasrin Kader Siddiqui vs Bangladesh 44 DLR(AD)16]”
(তথ্যসংক্রান্ত প্রশ্ন অথবা তথ্য ও আইনের বিশ্লেষণ মিশ্রিত প্রশ্ন সংবিধানের ১০২ ধারা অনুযায়ী হাইকোর্ট ডিভিশনে উত্থাপিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। আপিল বিভাগকে প্রাথমিক বিচারিক আদালতে পরিণত করার সুযোগ গ্রহণ করা থেকে মামলার আপিলকারীকে সাধারণভাবে নিবৃত্ত করতে হবে।)
উপরোক্ত রায়ের আলোকে এক-এগারো পরবর্তী চেম্বার জজদের রায়ের বিশ্লেষণ করা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই অত্যন্ত জরুরি। হাইকোর্ট ডিভিশন থেকে সরকারের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের রুল ও স্থগিতাদেশ জারি হওয়া মাত্র চেম্বারে সেই রায় স্থগিত করার প্রবণতা বিগত সাড়ে ৩ বছরে বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী হাইকোর্ট ডিভিশনে তথ্যের সত্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা এবং আইনি প্রশ্ন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের সুযোগ সঙ্কুচিত করে ইনসাফের রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। কোনো মামলায় হাইকোর্ট ডিভিশন রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেয়ার পর আপিলের অবশ্যই যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু সরকারকে হাইকোর্ট বিভাগের রুলের জবাব দেয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে বাঁচানোর অপচেষ্টাকে আর যাই হোক আইনের শাসন বলা যেতে পারে না। এতে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও বিশ্বস্ততা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের যৌথ, সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল। সেই স্বাধীনতার খোলসের আড়ালে বিচার বিভাগের এমন বন্দিদশা এদেশে আমরা আগে কখনও দেখিনি। মরহুম শেখ মুজিবের ফ্যাসিবাদী শাসনামলেও রক্ষীবাহিনীর কার্যক্রমকে বেআইনি ঘোষণা করে রায় দেয়ার মতো বিবেকসম্পন্ন ও সাহসী বিচারকরা উচ্চ আদালতে ছিলেন। এদেশের নাগরিকের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সেই সময় হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ পরস্পরকে সহযোগিতা করতেন। এক-এগারো দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার পাশাপাশি উচ্চ আদালতের দুই বিভাগকেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের ভূমিকায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এবং এর সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে আদালতপাড়ায় নজিরবিহীন দলীয়করণ। সামগ্রিক অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছে যে, উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারকবৃন্দ তাদের নিয়োগপ্রাপ্তির সংবর্ধনার আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় সংবিধান ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করার পরিবর্তে দলীয় নেতানেত্রীদের বন্দনাতেই অধিকতর সময় ব্যয় করেন।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে মাননীয় বিচারকদের সঙ্কীর্ণ দলীয় চিন্তাধারা অতিক্রম করে কেবল সংবিধান ও দেশের আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়া অত্যাবশ্যকীয়। আমাদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিচার বিভাগকে দলীয়করণের যে মন্দ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে সেখান থেকে তারা নিবৃত্ত না হলে জাতি হিসেবে আমরা ক্রমেই অনিবার্য ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাব। আমাদের দেশের দুর্গতির জন্য এক সময় ব্যবসায়ীদের দায়ী করা হতো। তারপর আমলা এবং রাজনীতিকদের। একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শেষ ভরসার স্থল বিচার বিভাগ এবার কলঙ্কিত হয়েছে। বিচারপতি নিয়োগ থেকে শুরু করে বিচারকদের আচার-আচরণ, সর্বত্র অবক্ষয়ের সুস্পষ্ট চিহ্ন দৃশ্যমান। এই অনাচারের পরিণামে জাতি হিসেবে সম্মিলিতভাবে শেষ পর্যন্ত হয়তো চরম মূল্যই আমাদের দিতে হবে। বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানে অন্যায়-অবিচারের ভয়াবহ বিস্তৃতি এক সময় দোষী নির্দোষ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সব নাগরিককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে যখন ক্যালদীয়রা পবিত্র নগরী জেরুজালেম আক্রমণ করতে ধেয়ে আসছিল, সেই সময়ের নবী যেরেমিয়া আক্ষেপ করে বলেছিলেন, জাতির সঞ্চিত পাপ সমস্ত জাতিকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় (অভিশপ্ত নগরী, সত্যেন সেন)।
গত শনিবার সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের এক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বক্তৃতাকালে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, এক-এগারোর ভূত এখনও সুপ্রিমকোর্টে ঘোরাফেরা করছে। ভূত তাড়ানোর জন্য তিনি সেখানে মিলাদ পড়ানোরও প্রস্তাব করেছেন। একই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া অবশ্য সেই এক-এগারোর ভূতকে তাড়ানোর জন্য গণ-আন্দোলনের কথা বলেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, মাননীয় বিচারপতিরা ভূতের হাত থেকে আদৌ নিষ্কৃতি পেতে চান কিনা। আগেই বলেছি, কয়েকজন ব্যতিক্রম ছাড়া অন্যদের মধ্যে বিবেকের অস্তিত্ব দুঃখজনকভাবে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রায় প্রদানকালে আইনের ব্যাখ্যার পরিবর্তে বাদীর রাজনৈতিক পরিচয় এখন অধিকতর গুরুত্ব পাচ্ছে। যে বিচারপতি বিশেষ কোনো দলের দণ্ডপ্রাপ্ত নেতাকে আইনবহির্ভূতভাবে বিরল ছাড় দিয়ে হাইকোর্ট থেকে সরাসরি জামিন দিচ্ছেন, তিনিই আবার অন্যদের ক্ষেত্রে ন্যায্য জামিন স্থগিত করছেন। এক বিচারপতি তো বিদেশি নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করে উচ্চ আদালতে বিচারকের চাকরি নিয়ে দিব্যি দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। হারানো বিবেক ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ এদের মধ্যে জনগণ দেখতে পাচ্ছে না। নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তারা বরং আদালত অবমাননা নামক এক দেয়াল খাড়া করে আত্মরক্ষার ব্যর্থ চেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছেন। বিচার বিভাগের করুণ অবস্থা প্রত্যক্ষ করেই সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের বিচার বিভাগকে কাচের ঘরের সঙ্গে তুলনা করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি এই ভঙ্গুর ঘরটির যে কোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন। যে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এক-এগারো পরবর্তী সময়ে সাহসিকতার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনিও নির্বাচিত সরকারের আমলের বিচার বিভাগের ভূমিকায় একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রদত্ত সাক্ষাত্কারে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
অত্যাচারী শাসক ও ক্ষমতাবানদের নির্যাতন, নিপীড়ন, জুলুম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই একজন মজলুম নাগরিক আদালতের শরণাপন্ন হয়। পৃথিবীতে বিচারকদের ওপরই ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মহান দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্তায়ালা পবিত্র কোরআন শরিফের সুরা আল-হাদীদের ২৫নং আয়াতে বলেছেন, ‘আমি আমার রসুলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।’ আজকের বাংলাদেশের আদালতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনরা প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। দুর্ভাগ্যক্রমে বিচারকদের মধ্যকার একটি বৃহত্ গোষ্ঠী ক্ষমতাসীনদের এসব অপতত্পরতার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিরোধ সৃষ্টি না করে বরং ন্যক্কারজনকভাবে তাদের সক্রিয় সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এসব বিচারকের মধ্যে কেউ কেউ আবার বাহ্যিকভাবে নাকি ধর্মপালনও করে থাকেন। ধর্মপালনকারীদের মধ্যকার ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা শুনেছি নিয়মিত নামাজও আদায় করেন। তাদের উদ্দেশ্যে সুরা আল-বাকারা’র তিনটি আয়াত উদ্ধৃত করে আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন সমাপ্ত করব।
সুরা আল-বাকারা
(৮) আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ঈমানদার নয়।
(৯) তারা আল্লাহ্ ও ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এতে তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না।
(১০) তাদের অন্তকরণ ব্যাধিগ্রস্ত এবং আল্লাহ্ তাদের ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তুত তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আজাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন।
পুনশ্চ : লেখার শুরুতেই বলেছিলাম আমার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে আদালত অবমাননার একটি মামলা দায়ের হয়েছে। আজই সম্ভবত আপিল বিভাগে সেই মামলার প্রথম শুনানি। পাঠক যখন আমার এই লেখা পড়ছেন তখন হয়তো আপিল বিভাগে আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার শুনানি চলছে। আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন লেখার অপরাধে আদালত অবমাননার দ্বিতীয় মামলা মোকাবিলারও আগাম মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম। মহান আল্লাহ্ আমাদের সুপথে পরিচালিত করুন।